মাটির মায়া
রঞ্জন বিশ্বাস।
শেষ বিকেলের আলো ক্রমে ম্লান হয়ে আসে।
ঝাপসা দু’চোখ,স্মৃতির আয়নার ভাসে
ফেলে আসা পুরনো অতীত। তৃষ্ণার্ত আবেগ নিয়ে
নিষ্পলক চেয়ে থাকি দিনে, রাতে
আমার শৈশব-কৈশোর-মাখা গাঁয়ের শ্যামল ছায়াতে।
মনে পড়ে যায় আমাদের বটতলা;তার ছায়াতলে
ডাংগুলি-কানামাছি,কত সকালে-বিকালে
আরো কত খেলা খেলিয়াছি।অপরাহ্ণ বেলায়
চৈত্র মাসের শেষে চড়কের মেলায়
রঙিন মাটির হাড়ি,মাটির ঘোড়ার গাড়ি
প্লাস্টিকের খেলনা,বেলুনের বাঁশি-তুচ্ছ এরা সবে
কিশোর বালকেরে যোগায়েছে প্রাণ-ভরা হাসি।
আরো মনে উঁকি মারে গ্রামের সেই খেয়াঘাট-
তার পাড়েই ছিল তিনকড়ি পাটনির বাস,
জীর্ণদশা জীবনের সাথে আঁটসাঁট করে বাধাঁ ছিল
জোড়া-তালি দেয়া তার খেয়া নৌকাখানা।
কত বর্ষাকালে, আজ মনে পড়ে–
নিছক দুষ্টুমির ছলে
ডুবায়ে দিয়েছি তার ভাঙ্গা খেয়াটারে
ঘাটের কিনারে।তারপরে অবশেষে
তৃপ্তির হাসি হেসে ফিরে গেছি ঘরে।
সেই সব কথা, আজ অপরাহ্ন কালে
বিষন্ন অন্তরে আনে অনুশোচনা
জাগায়ে তুলিতে চায় নিদারুণ ব্যাথা।
দুপুরে স্নানের কালে, কখনো বা খেলাছলে
পাড়ার সাথীদের সাথে
আমার দুরন্ত কৈশোর
আছড়ে পড়েছে ভরা গাঙ এর জলে,
এ পাড়ের জৈ-বট,হিজলের,কদমের শাখা হতে।
উদ্দাম সাঁতার কেটে, অবশেষে
দু’ চোখ লাল করে থামতাম এসে
খেজুর-গুড়ি দিয়ে বাঁধানো আমাদের গাঙের ঘাটে।
ওপারে হাম্বা-হাম্বা স্বরে পরম মমতাভরে
সদ্যস্নাত বাছুরের গা-চাটে
ঠাকু’মার আদরের লালী গাই।
কত কিছু মনে আসে,আরো কত মনে নাই-
ন্যাপথালিন দেয়া তোলা-কাপড়ের ঘ্রাণের মত
তারা সুখের পুরনো সুবাস নিয়ে
ভীড় করে বুকের ভিতরে।
কত দেশে ঘুরলাম, কত নগরে-বন্দরে
কাটালাম কতদিন আদরে-অনাদরে
এ জীবন। আজ শুধু মনে পড়ে–
আমার গাঁয়ের পরে
ফেলে আসা সেদিনের কত প্রিয় মুখ
পুরনো পুকুর ঘাট,বৈঁচি বাগান,
ধানের পালায় সাজানো আমাদের নিকানো উঠান।