পাষাণী।
——————–রোজা।
আমি তখন নবম শ্রেণি নতুন বিদ্যালয়ে
রোমিওদের ভিড়ে আমার সময় কাটে ভয়ে।
সবার সেরা দুষ্টু ছিলো কালো মজনু মিয়া
হৃদয়টা তার দেবার জন্য ঘুরে হাতে নিয়া।
একই গাঁয়ে থাকি দুজন একই পথে চলা
আমার সাথে বলতে কথা হাজার ছলাকলা।
ফেরার পথে সেদিন হঠাৎ আচমকা বদ ছেলে
ল্যাং মেরে সে পথের পরে আমায় দিলো ফেলে।
পরে গিয়ে তব্দা মারি তাকাই ঢেলা চোখে
বদ ছেলেটাই তুলল টেনে তৃপ্তি লাগা মুখে।
অপমানে দগ্ধপ্রাণে হাঁটা দিলাম সোজা
পেছন থেকে চেঁচায় বেটা আই লাভ ইউ রোজা।
ক্লাসের পড়ায় আসা যাওয়ায় ঠুকাঠুকি শত
মজনু মিয়ার প্রেমের মিটার বাড়ছে অবিরত।
আমিও নই তুলসীপাতা খাঁটি দুধের ছানা
চোখ ঈশারে আসতে বলি মুখে করি মানা।
এমনি করে যাচ্ছিল দিন চাপার মতো ফুটে
নবম শ্রেণির হলো ইতি দশম শ্রেণি উঠে।
ক্লাসের সেরা মজনু মিয়ার রোল নেমেছে তিনে
লাটসাহেবের অবনতি প্রেম পিরিতির ঋণে।
ঝরো ঝরো বৃষ্টি নিয়ে বর্ষা এলো চলে
গাঁয়ের রাস্তা মাখা মাখা কাদা এবং জলে।
পাজি ছেলের ভয়ে আমি দৌড় দিয়েছি যেই
কাদার পরে পিছলে পড়ে একটা পা আর নেই।
ও বাবা গো মা গো বলে কাঁদতে কাঁদতে বলি
পিছলে পড়ে ভেঙ্গে গেছে আমার পায়ের নলি।
আসলে তো হয়নি কিছু ব্যাপার ছলনার
কতটা সে ভালোবাসে ইচ্ছে ছিলো মাপার।
ভ্যাবাচ্যাকা মজনু মিয়ার মুখটা ফিকেফিকে
পাঁজা কোলে তোলে নিয়ে চলল বাড়ির দিকে।
গাঁয়ের পথে এমন নাটক কেউ দেখেনি আগে
প্রজার কোলে রাজার বেটি নানান প্রশ্ন জাগে।
ডাল মেলেছে কথার কথা গাঁয়ের বাঁকে বাঁকে
অমুক ছেলে ভালবাসে তমুক মেয়েটাকে।
আমার বাবা পিরের জাদা সবাই হুজুর মানে
কথাখানা এঁকে-বেঁকে পৌঁছল উনার কানে।
গর্জে উঠে ধর্ম বাবার আল্লাহ মালেক সাই
এক নিমিষে তারে আমার চোখের সামনে চাই।
থরোথরো মজনু মিয়া পায়ের উপড় খাড়া
বাবা বলেন উপায় আছে দাও যদি কাফফারা।
ঈমান আমল সহি দিলে আনতে সঠিক রাহে
যেতে হবে তিন চিল্লাতে বুঝলে কিনা বাহে?
চিল্লা দিতে মজনু গেলো তেতুলিয়ার পথে
আমার সময় মরুভূমি যায়না কোনোমতে।
বাবা আমার ব্যস্ত তখন অন্য বিষয় নিয়া
একুশ দিনের মাথায় আমার দিয়ে দিলেন বিয়া।
চিল্লা শেষে বাড়ি ফিরে খবর শোনে মিয়া
ইচ্ছে হলো নিজের মাথা ভাঙ্গে মুগুর দিয়া।
করবে কী সে কী করা যায় কারে দেবে সাজা
এক সাধারণ ঘরের ছেলে নয়তো দেশের রাজা।
বেশ কিছুদিন পাগল বেশে এদিক সেদিক করে
চিল্লাতে ফের চলে গেলো এক জনমের তরে।
অনেক কথার দায় ঘুচাতে মনটা খুলে দিলাম
আমি কিন্তু মজনু মিয়া সত্যি তোমার ছিলাম।
অনেক বছর পার হয়েছে ফেরেনি আর ঘরে
আশায় আছি আর জনমে দেখবো দুচোখ ভরে।
ঘুমায় যখন এই দুনিয়া বুকে পাষাণ বাঁধি
আজো বন্ধু আমি তোমার নাম ধরিয়া কাঁদি।