প্রচন্ড শীতের মধ্যে মেয়ে আর আমি ঘরবন্দী। কতক্ষণ থাকা যায় এভাবে! মেয়েকে বললাম, চলো বাইরে ঘুরে আসি; তোমার পছন্দের কফি শপে চা-পান করে আসি। মেয়ে ও আমি বের হলাম। হাঁটতে হাঁটতে মেয়েকে বললাম- জীবন কোন স্থীর চিত্র নয়- এটা একটা মুভি। মানুষ, তার জীবনে অনেক ঘাত-প্রতিঘাত, ঝড়-ঝাপটা মোকাবেলা করে; কিন্তু নিজেকে পরিবর্তন করে না। সফটওয়ার যেমন আপডেটেড হয় মানুষের জীবনকেও আপডেটেড ভার্সন চালু করতে হয়। ‘এখন তুমি একটা গল্প শোনাও’- মেয়েটা আমাকে থামিয়ে দিল। ঠিক আছে, আম্মু- বলে শুরু করলাম-
আজ তোমাকে ফেডএক্স (FedEx), আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সার্ভিসের প্রতিষ্ঠাতা ফ্রেডরিক ডব্লিউ স্মীথ সম্পর্কে বলবো। মি. ফ্রেডরিক ১৯৪৪ সালে মিসিসিপি অঙ্গরাজ্যে জন্মগ্রহণ করেন। জন্ম থেকেই তিনি হিপের হাড়ের সমস্যায় ভুগেছেন। ১০ বছর বয়সে সুস্থ্য হবার আগ পর্যন্ত তিনি ক্রাচে ভর দিয়ে হাঁটতেন। ৪ বছর বয়সে বাবা মারা যান। বাবা তার সমস্ত সম্পত্তি এমনভাবে উইল করেন যেন- সন্তানেরা ২১ বছর না হওয়া পর্যন্ত কোন সম্পত্তি-অর্থ-কড়ি না পায়। সন্তানেরা যেন নিজেরা স্বাবলম্বী হতে পারে ও নিজের মধ্যে ট্যালেন্ট তৈরী হয়। সে কারণে তিনি এই ব্যবস্থা নেন। মি. ফ্রেডরিক কর্মজীবন শুরু করেন ইউএস আর্মিতে যোগ দিয়ে। ভিয়েতনাম যুদ্ধে তিনি সরাসরি অংশগ্রহণ করেন। ৪ বছর চাকুরী করে লেখাপড়ায় ফিরে আসেন। ১৯৬২ সালে ইয়েল ইউনিভার্সিটিতে অর্থনীতি বিষয়ে ভর্তি হন। একটি পরীক্ষায় তিনি লেখেন- ২৪ ঘন্টার মধ্যে বিশ্বের যে কোন প্রান্তে মালামাল/ মেইল পৌছে দেয়া হতে পারে একটি লাভজনক ব্যবসা। শিক্ষক বিরক্ত হয়ে তাকে ‘সি’ গ্রেড দেন। যাই হোক- পরবর্তীতে তিনি FedEx নামে অভ্যন্তরীন কুরিয়ার ব্যবসা প্রতিষ্ঠা করেন। ইউরোপের অর্থনৈতিক মন্দা ও বিশ্ববাজারে তেলের দাম বৃদ্ধিতে ব্যবসা ক্ষতির মুখে পড়ে। ব্যাংক লোন মেলেনি।
লাস ভেগাসে ৫০০০ ডলার নিয়ে ক্যাসিনোতে ব্রাকল্যাক নামক জুয়া খেলে ২৭০০০ ডলার জিতে- ২৪০০০ ডলার তেলের দেনা পরিশোধ করে আবার ব্যবসা শুরু করেন।
বর্তমানে বিশ্বের ২০০ টি দেশ/ভূখন্ডে FedEx এর কার্যক্রম চালু রয়েছে। তার অধীনে ৭১৪ টি এয়ারক্রাফট, ২,১৫,০০০ টি যানবাহন (ট্রাক), ৫১৭৮ ধরণের সুবিধা, ৫,৫০,০০০ জন কর্মচারী নিয়ে গড়ে প্রতিদিন ১৫ মিলিয়ন শিপমেন্ট করছে FedEx কোম্পানী।
টাইম ম্যাগাজিন ও ফরচুন ম্যাগাজিনে বিশ্বের মোট ১০০ কোম্পানীর মধ্যে সবচেয়ে প্রশংসিত কোম্পানী এই FedEx . ১৯৯০ সালে ম্যালকম ব্যালড্রিজ ন্যাশনাল কোয়ালিটি পুরষ্কার পান। ২০১৪ সালে ৫০ জনের মধ্যে ২৬ তম গ্রেটেস্ট লিজেন্ডে ভূষিত হন। তৎপূর্বে ২০০০ ও ২০০৪ সালে মার্কিন কংগ্রেস ক্ষমতা নিলে জর্জ বুশ তাকে ফরেন সেক্রেটারীর পদের প্রস্তাব দেন, কিন্তু প্রথমে তিনি নিজের শারিরীক কারণে এবং ২০০৪ সালে মেয়ের অসুস্থ্যতার কারণে তা প্রত্যাখান করেন।
এতকথা কেন বললাম জান? তিনি একজন পথপ্রদর্শক ব্যবসায়ী। তিনি কোম্পানীর কোন কর্মচারীর বেতন বন্ধ করেননি, বোনাস ও মেডিক্যাল সুবিধা চালু রাখা, ছাটাই না করা, প্রয়োজনে নিজে জুয়া খেলেছেন- ঝুঁকি নিয়েছেন; তবুও কর্মীদের ভালবেসেছেন। ১০ বছরের অধিক কাল চাকুরী করা কর্মীদের সাথে তিনি সকালের নাস্তা করতেন। যখন অন্যান্য প্রতিদ্বন্দ্বি কোম্পানী মার খেতে থাকে- তখন কর্মীদের সাথে রাতদিন পরিশ্রম করেন, তার জন্যে তিনি অতিরিক্ত বোনাস দেন। FedEx কোম্পানীর মূল নীতি হিসাবে তিনি PSP অর্থাৎ People. Service. Profit. প্রতিষ্ঠিত করেন।
আম্মু, কর্মীদের ভাল না বাসলে কোন নেতৃত্বই টিকে না। সম্পর্ক অনেক ‘দাম’ দিয়ে কিনতে হয়। আর এই ‘দাম’ হলো ভালবাসা।
মেয়েটা বললো, আব্বু, আমরা এসে গেছি। (চলবে…)