রবিবার, ২৫ জুলাই ২০২১, ০৮:৪৪ অপরাহ্ন
শিরোনাম
কেশবপুরে বিধি-নিষেধ অমান্য করায় ব্যবসায়ীসহ ১৭ ব্যক্তিকে অর্থদন্ড শ্বশুরবাড়ি থেকে ঈদে দাওয়াত না পাওয়ায়’ স্ত্রীকে পিটিয়ে হত্যা পিরোজপুরের নেছারাবাদ কুড়িয়ানার পেয়ারা বাগান পরিদর্শনে বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার লৌহগড়ায় ৮০ পিচ ইয়াবাসহ ১ জন আটক দফতরে ফিরতে রিজভীর প্রধান বাধা ফখরুল এই বাংলায় আমি ফিরে ফিরে আসি -এমামুল হক টগর হেলেনা জাহাঙ্গীর আওয়ামী লীগের পদ হারালেন লালমনিরহাটে করোনা আক্রান্ত হয়ে ইউনিয়ন পরিষদের সচিবের মৃত্যু টেকেরহাট বন্দরে প্রায় ৫ মাস যাবত এই ছেলেটির কোন ওয়ারিশ পাওয়া যাচ্ছে না মাদারীপুরে বাহাউদ্দিন নাছিম ফাউন্ডেশনের উদ্যেগে ফ্রি অক্সিজেন সিলিন্ডার সরবরাহ
নোটিশ
যে সব জেলা, উপজেলায় প্রতিনিধি নেই সেখানে প্রতিনিধি নিয়োগ দেয়া হবে। বায়োডাটা সহ নিউজ পাঠান। Email: [email protected]

খণ্ডিত বাঙালি অখণ্ড নজরুল- আলকামা সিদ্দিকী

আলকামা সিদ্দিকী
Update : মঙ্গলবার, ২৫ মে, ২০২১, ৯:২০ পূর্বাহ্ন

খণ্ডিত বাঙালি অখণ্ড নজরুল
আলকামা সিদ্দিকী
——————————-
তাঁর কবিপ্রতিভার উন্মেষকাল থেকেই নজরুল খণ্ডদৃষ্টির শিকার। বলা হয়ে থাকে তাঁর এই খণ্ডিত-দশার উৎসমূল নজরুলের সৃষ্টিতেই নিহিত, এ বিবৃতিটি কোন সত্যকে ধারণ করে না বরং সত্যকে আড়াল করার জন্য এ বিবৃতি একটি অপযুক্তিকে প্রতিষ্ঠা করার কাজে ব্যবহৃত হয়। নজরুলের খণ্ডিত-দর্শন দশার দায় নজরুলের সৃষ্টির নয়, এ দায় বাঙালির খণ্ডিত সত্তার। বাঙালি তার ইতিহাসের কোন পর্যায়েই অখণ্ড জাতিসত্তায় পরিণত হতে পারে নি। জাত-পাত, ধর্ম, বর্ণ, পেশা এমন কি উপজীবিকা ভিত্তিক বিভাজন বাঙালিকে প্রায় চিরস্থায়ীভাবে বিভক্ত করে রেখেছে এবং এই বিভাজন বাঙালির সামাজিক কাঠামোয় অঙ্গীভূত হয়ে গেছে। নজরুল তাঁর সমগ্র সৃষ্টির ভেতর দিয়ে আমাদের সম্মুখে যে বিশাল অখণ্ডতা নিয়ে বিরাজমান তাঁর সেই অখণ্ড বিশালতাকে ধারণ করার মতো জাতিগত নিরঙ্কুশ অখণ্ড অস্তিত্ব আমরা তার সমকালে তো নয়ই দূর অতীতে অর্জন করতে পারি নি অদূর ভবিষ্যতে পারব কি না তাও নিশ্চিত করে বলা যায় না। কখনো ধর্মীয়সাম্প্রদায়িক ভেদভাবনা, কখনোবা তার চাইতেও ভয়াবহ ধর্মীয় মৌলবাদ আমাদের জাতিসত্তার একক কাঠামোকে ধ্বংস করেছে। আর তার সাথে সাথে সংকীর্ণ ও খণ্ডিত করেছে আমাদের জাতীয় অর্জন ও অহংকারগুলোকে। অথচ মানুষের কোন বিভাজনই স্বাভাবিক বা প্রাকৃতিক নয়, এটি ঐতিহাসিক ও বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত সত্য, মানুষে মানুষে এই ভেদনীতি ঈশ্বর অনুমোদিতও নয়; নজরুল তাঁর সমস্ত সৃষ্টির ভেতর দিয়ে মানবজাতির জন্য এই বার্তাটি রেখে গেছেন। এই তথ্যটি যুক্তি বা তর্ক সাপেক্ষ নয় বরং তা নজরুল রচনার সর্বত্রই স্বতঃস্ফুর্ত। সমস্যা হলো তা অনুধাবনের, অনুমোদনের এবং অনুসরণের।
সাম্প্রদায়িকতার নিগড়াবদ্ধ একটি অপসাংস্কৃতিক অসুস্থতার পটভূমিতে সাম্প্রদায়িক ভেদভাবনাবিমুক্ত নজরুলের আবির্ভাব ও উত্থান বিস্ময়ের উদ্রেক করে, সন্দেহ নেই, তবে এ সত্যও আমাদের মনে রাখতে হবে যে, নজরুলের শৈশব-কৈশোরের স্বয়ংসৃষ্ট উদ্দামতা, শৃঙ্খলহীনতা এবং নির্বিচার সৌহার্দ তাঁর পরবর্তী জীবনের মানস গঠনে রসদ জুগিয়েছে। নজরুলের জন্ম একটি সম্ভ্রান্ত অথচ দারিদ্রক্লিষ্ট মুসলমান পরিবারে হলেও শৈশব-কৈশোরের অর্গলমুক্ত পরিবেশ তাঁকে বিশেষ কোন গোষ্ঠি-সংস্কৃতি বা প্রচলিত অর্থে নিখাদ কোন ধর্মীয় শিক্ষা প্রভাবিত করতে পারে নি। তাঁর শৈশব ও কৈশোরের যাপিত জীবনটি বস্তুত একটি বহুধার্মিক অবশেষে ধর্মনিরপেক্ষতার জারক রসে জারিত। এটি কোন তত্ত্ব নয়, এটি তাঁর জীবনের প্রামাণ্য সত্য। শৈশব-কৈশোরের এই বিশুদ্ধ অসাম্প্রদায়িক নজরুলের ভেতরেই উপ্ত হয়েছিল নজরুলসৃষ্টি মহিরুহের বীজ।
নজরুলের সংক্ষিপ্ত অথচ তাৎপর্যপূর্ণ সৈনিকজীবনের অভিজ্ঞতা বিশেষত রুশ বিপ্লব ও সাম্যবাদের সঙ্গে তাঁর পরিচয় কবির চেতনা জগতে একটি স্থায়ী প্রবণতার দৃঢ় ছাপ ফেলে যা পরবর্তীতে তাঁর চিন্তাকাঠামোর অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়ায়। বস্তুত নজরুল তাঁর সৃষ্টির সর্বত্রই উচ্চকণ্ঠে সাম্যবাদের মাহাত্ম্য ও জয়গান গেয়েছেন। তাঁর দৃষ্টিতে সাম্যবাদেই মানুষের প্রকৃত মর্যাদা ও মনুষ্যত্বের অভেদরূপ সংরক্ষিত হতে পারে। নজরুল তাঁর রচনায় ধর্মের যে জয়গান গেয়েছেন সে জয়গান ধর্মীয় কূপমণ্ডুকতার জয়গান নয়, সব ধর্মেই সাম্যবাদ ও বিশ্বভ্রাতৃত্বের একটি সত্য ও সুন্দর রূপ আছে। নজরুল সকল ধর্মের মধ্যে সেই চিরকল্যাণকর রূপটি সন্ধান করেছেন এবং ধর্মরোগগ্রস্ত জাতিকে তার সন্ধান দিয়েছেন। ধর্ম ও ধর্মান্ধতা, ধর্মাচারণ ও ধর্ম ব্যবসার মৌলিক ব্যবধানটি তিনি স্পষ্ট করে গেছেন তাঁর ধর্মীয় স্তবগানেও।
নজরুল তাঁর আবির্ভাবকালে তাঁর দেশ ও জাতিকে যে অবস্থায় দেখেছেন তা তাঁকে পীড়িত করেছে। ঐ সময়ের মৌল সংকটটিকে তিনি চিহ্নিত করতে পেরেছিলেন তথাকথিত রাজনীতিকদের চেয়ে অনেক ভালোভাবে এবং স্পষ্ট করে। পরাধীনতার অসম্মানকে তিনি সাদা চোখে মনুষ্যত্বের অপমান হিসেবে দেখেছেন। এই অবস্থার অবসানের জন্য তিনি স্বাধীনতার কোন বিকল্পকে তাঁর চিন্তা-চেতনায় আশ্রয় দেন নি। তাঁর সমকালের রাজনীতির ধ্বজাধারীরা যখন স্বাধীনতার দাবি তো দূরের কথা রাজনৈতিক পাঠশালায় স্বাধীনতা শব্দটি উচ্চারণেও দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন তখন তিনি ভারতবর্ষের জন্য সবার আগে যা প্রয়োজন তা হলো ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা এই বাণী উচ্চকণ্ঠে উচ্চারণ করেছেন। তিনি অনুধাবন করেছিলেন এবং মনে-প্রাণে বিশ্বাস করেছিলেন স্বাধীনতা কেউ এমনি এমনি দেবে না, তা অর্জন করতে হবে, ছিনিয়ে নিতে হবে। স্বাধীনতা অর্জন করতে হলে, তা ছিনিয়ে নিতে হলে তার জন্য প্রয়োজন সাহস ও শক্তির। এই সাহস ও শক্তির পথে মূল অন্তরায় জাতির চিরন্তন অনৈক্য তথা সাম্প্রদায়িকতা আর এই সাম্প্রদায়িকতার মূলে ধর্মের অপব্যাখ্যা, ধর্মের নামে ধর্মান্ধতা, অসহিষ্ণুতা, পরস্পরের প্রতি অবিশ্বাস। এর সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত আত্মবিশ্বাসহীনতা। ধর্মীয় কূপমণ্ডুকতায় আচ্ছন্ন সাম্প্রদায়িক ভেদভাবনাজর্জরিত জাতির মধ্যে ঐক্য ও আত্মবিশ্বাসের উদ্বোধন ঘটানোর জন্য নজরুলে হৃদয়ের আকুতি খুঁজতে আমাদের বিশেষ হয়রান হতে হয় না। তাঁর কবিতা, গান, নিবন্ধ, অভিভাষণ সবখানে তাঁর এই আকুতি প্রকটিত।
একদিকে মানুষে-মানুষে সাম্য-ভ্রাতৃত্ব, অন্যদিকে পরাধীন দেশের স্বাধীনতা ও স্বজাতির জাত-পাত, ধর্মকেন্দ্রিক সাম্প্রদায়িকতার অবসান এই ছিলো দর্শন ও সারাজীবনের অন্বেষা। নজরুলের এই মৌলিক দর্শন ও অন্বেষার আলোকেই তাঁর সৃষ্টির ব্যাখ্যা ও মূল্যায়ন হওয়া উচিত। নজরুলের খণ্ড-দর্শন অন্ধের হস্তি দর্শনের মতোই মিথ্যা দর্শনের নামান্তর। নির্মম সত্য এই যে, নজরুল বার বার খণ্ডিত-দর্শন হয়েছেন, আরো দূর্ভাগ্য হলো তাঁর এই খণ্ডিত দশাকে কূটতত্ত্ব ও কুযুক্তি দিয়ে প্রতিষ্ঠিত করতে চাওয়া হয়েছে। তাঁর সচেতন জীবদ্দশাতেও তা করা হয়েছে। একাধিকবার তিনি যবন ও কাফের আখ্যা পেয়েছেন তাঁর স্বদেশবাসীর কাছ থেকে।
তাঁর সৃষ্টির যে ধারাকে নজরুলকে খণ্ডিকরণের খাঁড়া হিসেবে চালনা করা হয় তা হলো তাঁর তথাকথিক ধর্মীয় রচনা। কিন্তু খণ্ডবাদীরা যদি তাঁর এসব রচনার বাইরের খোলসটিকে খুলে ফেলে তার ভেতরকার প্রাণের সন্ধান করতো তাহলে নজরুলের পূর্ণদর্শনের সাথে সাথে নজরুল ধর্মের যে চির সুন্দর রূপের সন্ধান দিয়েছেন তার দেখা তারা পেতো আর বাঙালি নিঃশঙ্কচিত্তে অধিকার করতে পারতো এক মহান উত্তরাধিকার। তাঁকে খণ্ডিত করে দেখার বিরুদ্ধে তিনি তার সচেতন জীবদ্দশায় বার বার তাঁর জাতিকে সতর্ক করে দিয়ে গেছেন, বার বার বলে গেছেন- তিনি কেবল হিন্দুর বা কেবলই মুসলমানের নন, তিনি বাঙালির, তিনি বিশ্বমানবতার। তাঁর ঈশ্বর দাড়িঅলাও নন টিকিঅলাও নন। তাঁর ঈশ্বরের কোন জাত নেই। তাঁর ইসলামি জাগরণী কবিতা ও গানে সবকিছুকে ছাপিয়ে যে সত্য বেরিয়ে এসেছে তা হলো সাম্যবাদ- যা ইসলামের চির শাশ্বত রূপ আর আছে আত্মবিশ্বাসহীন উত্থানসম্ভবনারহিত জাতিকে জাগিয়ে তোলার ডাক। এ ডাকে তিনি কোন ভেদভাবনার অবতারণা করেননি। তিনি একজন খালেদকে চেয়েছেন:
খালেদ! খালেদ! ভাঙিবে না কি হাজার-বছরী ঘুম?
মাজার ধরিয়া ফরিয়াদ করে বিশ্বের মজলুম।
খালেদ খালেদ সত্য বলিব, ঢাকিব না আজ কিছু
সফেদ দেও আজ বিশ্ব বিজয়ী আমরা হটেছি পিছু।
খালেদের প্রতি তাঁর এই যে আকুতি তা কি কেবল মুসলমানের জন্য? বিশ্বের সমস্ত নিপীড়িত মজলুম জনগণের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা ধ্বনিত হয়েছে তাঁর এই বিবৃতিতে: “খোদার হাবিব বলিয়া গেছেন ঈসা আসিবেন ফের/ চাই না মেহেদী তুমি এসো বীর হাতে নিয়ে শমসের”। তাঁর এ প্রার্থনার তাৎপর্য অনুধাবনের জন্য গণমানুষের প্রতি দায়বোধ থাকতে হবে। খালেদ কবিতায় খালেদের প্রশস্তির আড়ালে দূর্ভাগ্যপীড়িত মানবগোষ্ঠীর মুক্তির জন্য যে সংগ্রামের প্রয়োজন, যে ত্যাগী নেতৃত্বের প্রয়োজন সেটিই তার মূখ্য চেতনা। ইসলামের মহান খলিফা উমর ফারুকের মাহাত্ম্য নিয়ে রচিত উমর ফারুক কবিতায়ও ধর্মের সত্য-সুন্দর রূপটিকে তুলে ধরার সাথে সাথে নির্যাতিত মানুষের মুক্তির দিশা খুঁজেছেন কবি:
উমর ফারুক! আখেরী নবীর ওগো দক্ষিণ-বাহু!
আহ্বান নয়- রূপ ধরে এস! গ্রাসে অন্ধতা রাহু
ইসলাম-রবি, জ্যোতি তার আজ দিনে দিনে বিমলিন!
সত্যের আলো নিভিয়া-জ্বলিছে জোনাকির আলো ক্ষীণ!
শুধু আঙ্গুলি-হেলনে শাসন করিতে এ জগতের
দিয়েছিলে ফেলি মুহম্মদের চরণে যে শমসের,
ফিরোদৌস ছাড়ি নেমে এস তুমি সেই শমসের ধরি।
এই প্রার্থনা ও আহ্বান কি কেবলই বীর প্রশস্তি? এর মধ্যে দিয়ে কি কবির গণমুক্তির আকাঙ্ক্ষাটিই ধ্বনিত হয়নি? নজরুল তাঁর বক্তব্যে এত স্পষ্ট যে নেহায়েৎ মতলববাজ বা মূর্খ না হলে তাঁর বাণীর তাৎপর্য অনুধাবন করা কারোর জন্যই কঠিন নয়। তবে ইসলামের এই মানবিক ও সৌম্য-সুন্দর রূপ, যে রূপ নজরুল সন্ধান করেছেন তা তাঁর কালের মতো আজো অধরাই থেকে গেছে মূলত ইসলামের তথাকথিত ধ্বজাধারীদের অপকর্মে ফলেই। তাঁর প্রায় সকল ইসলামি জাগরণমূলক কবিতায় বিধৃত হয়েছে মজলুমের ওপর জালিমের জুলুমের প্রতিবাদ এবং অবসানের উচ্চকণ্ঠ আহ্বান। মজলুমের কোন জাতি ধর্ম গোত্র বিভাজন তিনি মানেননি, পৃথিবীর যেখানেই অবিচার অত্যাচার নিপীড়ন সেখানেই তিনি তাঁর বাণী নিয়ে গেছেন। কামাল পাশা আনোয়ার পাশা জগলুল পাশা আমানুল্লাহ সকলেই তাঁর দৃষ্টিতে মজলুমের সহায়।
যে কবি সারাজীবন সংগ্রাম করে গিয়েছেন জাত-পাত ও ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে, তাঁর ভাগ্যের নির্মম পরিহাস তিনি বার বার সাম্প্রদায়িকতার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছেন। অবিভক্ত বাঙলায় হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ই তাঁকে খণ্ডিত করে দেখতে চেয়েছে এবং খণ্ডিত দর্শনের কারণে তাঁকে পরিত্যাগ করতে চেয়েছে। হিন্দু ভেবেছে তিনি মুসলমানের জয়গান গেয়েছেন, তিনি বিদেশি শব্দে কবিতা রচনা করেছেন তিনি যবন। মুসলমান তাঁকে খারিজ করেছে কারণ তিনি হিন্দু দেব-দেবীর প্রশস্তি গেয়েছেন। তিনি হিন্দু মুসলমানের চিরাচরিত ধর্মবোধের মূলে কুঠার হেনেছেন তিনি যবন, তিনি কাফের। বস্তুত ভেদ-ভাবনার দাসত্ব বরণকারী উভয় সম্প্রদায়ই তাঁকে খন্ডিত করে দেখেছে এবং উভয় সম্প্রদায়ের মানসিক দৈন্যের কারণেই নজরুল খণ্ডিত হয়েছেন। তিনি উভয় সম্প্রদায়ের ধর্মের ভেতরে যে চির কল্যাণকর রূপ আছে তাকে উভয় সম্প্রদায়ের সামনে হাজির করতে চেয়েছেন যাতে তাদের দূরত্ব ঘোঁচে, যাতে তারা পরস্পর ভ্রাতৃবন্ধনে আবদ্ধ হয়, ঐশ্বরিক প্রেমের ঝর্ণাধারায় সিক্ত হয়। তাঁর দূর্ভাগ্য, মুসলমান মুসলমানই থেকে গেছে, হিন্দু হিন্দুই। তাঁর জীবদ্দশাতে ভারতে যে ‘বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন’ বিদ্যমান ছিল দূর্ভাগ্যজনকভাবে সত্য তার কোন গণমুখী ও ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র ছিল না। ঐ সময়ের সকল রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মৌল চরিত্র ছিল চুড়ান্ত বিচারে চরম আপসকামিতা এবং ধর্মীয় পুনরুজ্জীবনবাদে নিরঙ্কুশ সমর্পণ। নিপীড়িত জনতার শোষণমুক্তি নয়, শাসন ব্যবস্থার পরিবর্তন এবং পরিবর্তিত শাসন ব্যস্থাকে নিরুপদ্রব করতে শাসক শ্রেণির সাথে শাসিতের একটি মানসিক বন্ধন সৃজনের ইচ্ছা রাজনীতির নিয়ামক শক্তি হিসেবে কাজ করেছে এবং এই মানসিক বন্ধন সৃষ্টির ক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকর চিরন্তন হাতিয়ার হচ্ছে ধর্ম। চিরকালই ধর্মের মতো একটি অপার্থিব এবং অবস্তুগত মানসিক অনুভূতি শাসন-শোষণকে নির্বিরোধ করার কাজে ব্যবহৃত হয়েছে। নজরুলের ধর্মচেতনা এই অপমানসিকতার সম্পূর্ণ বিপরীত। তাঁর মতে মানবতাকে খণ্ডিত করতে নয়, সকল মানুষকে একই ঈশ্বরের শ্রেষ্ঠতম সৃষ্টি হিসেবে, মুক্ত মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে ধর্মের উত্থান। ধর্ম তাঁর কাছে মানুষের সাম্য ও মুক্তির উপায়:
অন্যেরে দাস করিতে, কিংবা নিজে দাস হতে ওরে
আসেনি কো দুনিয়ায় মুসলিম ভুলিলি কেমন করে?
ভাঙ্গিতে সকল কারাগার, সব বন্ধন ভয় লাজ
এল যে কোরান, এলেন নবী, ভুলিলি সেসব আজ?
মানবতার মুক্তি আনতে যে ধর্মাচরণ ব্যর্থ তাকে তিনি বার বার ধিক্কার দিয়েছেন:
জীবনে যাদের হররোজ রোজা ক্ষুধায় আসেনি নিদ
মুমূর্ষু সেই কৃষকের ঘরে এসেছে কি আজ ঈদ?
এই পঙক্তিতে আমরা সন্ধান পাই সর্বহারার সেই চিরন্তন শ্রেণিচেতনা- একি কেউ অস্বীকার করতে পারে? ধর্মব্যবসায়ীরা কি নজরুলের এই ইসলাম প্রশস্তিকে মেনে নিয়ে তাদের জীবনাচরণে তা প্রতিষ্ঠিত করেছে? কখনো কি তারা তা পারবে:
আজ মুখ ফুটে, দল বেঁধে বলো, বলো ধনীদের কাছে
ওদের বিত্তে এই দরিদ্র দীনের হিসসা আছে।
ক্ষুধার অন্নে নাই অধিকার, সঞ্চিত যার রয়,
সেই সম্পদে ক্ষুধিতের অধিকার আছে নিশ্চয়।
মানুষেরে দিতে তাহার ন্যায্য প্রাপ্য ও অধিকার
ইসলাম এসেছে দুনিয়ায়।
ইসলামের মূল রস নিংড়ে তিনি যে বার্তা মানুষের সামনে পেশ করলেন তাকে গণ-সাহিত্য ছাড়া আর কী হিসেবে চিহ্নিত করা যায়? “নজরুলের সমগ্র সাহিত্য ও কর্ম-জীবনের প্রতি দৃষ্টিপাত করে স্বাধীনতাপূর্ব বাংলাদেশে তাঁকে এ দেশের গণ-সাহিত্যের একজন দিকপাল হিসাবেই চিহ্নিত করা হয়েছিলো। সেই হিসাবে তিনি ছিলেন সাহিত্য ক্ষেত্রে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী একজন জাতীয়তাবাদী যোদ্ধা। এই জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের অর্থও তাই তাঁর কাছে ছিলো এদেশের হিন্দু মুসলমানের সম্মিলিত সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আন্দোলন। তাঁর এই জাতীয়তাবাদের মধ্যে সাম্প্রদায়িকতা অথবা ধর্মীয় গোঁড়ামীর কোন স্থান ছিল না। মুসলিম লীগ এবং তার আদর্শ থেকে তিনি নিজেকে তাই তফাৎ রেখেছিলেন সতর্কভাবে। নজরুল সাহিত্যের অন্যান্য অনেক গৌণ পরিচয় থাকলেও এই ছিলো তাঁর আদর্শিক ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির মুখ্য পরিচয়। এবং এ পরিচয় বাতিল করার মতো নোতুন তথ্য-প্রমাণ আজ পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয় নি”। (বদরুদ্দীন উমর: সাংস্কৃতিক সাম্প্রদায়িকতা: নজরুল অহিফেন।) কিন্তু তাঁর এই ‘আদর্শিক ও রাজনৈতিক মুখ্য পরিচয়’কে আড়াল করার অপচেষ্টাও কম করা হয় নি বা হচ্ছে না।
সাম্প্রদায়িকতা-সৃষ্ট পাকিস্তান রাষ্ট্রে নজরুলের নতুন করে মুসলমানি করার চেষ্টা করা হয়েছে। তাঁর রচনা থেকে ‘অবাঞ্ছিত’ অংশ পরিহার করার হীন প্রচেষ্টাও চালানো হয়েছে যা চরম বালখিল্যতায় পর্যবসিত হওয়ায় সে কাজে ক্ষান্ত দিয়ে তাঁর মুসলমানি রচনাকে পাক-সাফ করে তোলার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বস্তুত ধর্মকে যারা শাসন ও শোষণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করায় অভ্যস্ত এবং যারা ধর্মকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আরোহণের সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহারের চরম অনিষ্টকর অপচেষ্টায় লিপ্ত তাদের হাতেই নজরুল এবং তাঁর সৃষ্টি খণ্ডিত হয়েছে সবচেয়ে ভয়াবহ মাত্রায়। ধর্মীয় মৌলবাদের একচক্ষু দৈত্যের কাছে নজরুলের ইসলামি রচনার অন্তর্নিহিত বাণী নয় তার বহিরঙ্গই অধিক উপাদেয়। এ ব্যাপারে আমাদের আরেক ভাই এবং প্রগতিশীল আঁতেলগণও কম দায়ী নন। খণ্ডিত বাঙালির আরেক আবাসভূমি পশ্চিমবঙ্গে নজরুলের উপস্থিতি নেহায়েত আনুষ্ঠানিক তাই অনুল্লেখ্য। জন্ম-মৃত্যুর দুটি দিন ছাড়া গণমাধ্যম ও গণসংস্কৃতির অঙ্গন নজরুল বিবর্জিত প্রায়। নজরুলের শ্যামাসঙ্গীত আর দেশভক্তিমূলক রচনা ছাড়া অন্য কোন রচনা তাদের কণ্ঠে যেন শোভা পায় না। পশ্চিমবঙ্গে প্রগতিশীল বামপন্থার রাজনীতির ব্যাপক চর্চা এবং ক্ষমতারোহণ ও ক্ষমতায় দীর্ঘ অধিষ্ঠান সত্ত্বেও সাম্প্রদায়িক ভেদভাবনা বিলুপ্ত হয়েছে তা বলা যাচ্ছে না। তাই সেখানেও নজরুল খণ্ডিত হয়ে আছেন। আমাদের দেশের প্রগতিপন্থীরা নজরুলের আধুনিকতা, গণতন্ত্র ও বিশ্বমানবতার বার্তা খুঁজতে কুণ্ঠিত হন। তাঁর শিক্ষার চেয়ে তাঁর জীবনের রহস্যই তাদের আকর্ষণ করে বেশি। অবশ্য সামান্য ব্যতিক্রম আছে।
নজরুলের সমগ্র দর্শনের উপযুক্ত পরিপ্রেক্ষিত বাঙালি নির্মাণ করতে পারেনি। এর ফলশ্রুতিতে যা হবার তাই হয়েছে- নজরুলকে সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদ গ্রাস করতে চেয়েছে। পাকিস্তানি আমলে এ ঘটনার একটি যুক্তিসঙ্গত কারণ দাঁড় করানো হতো, সহজেই। কিন্তু বাঙালির স্বাধীন আবাসভূমি বাংলাদেশে এই অবস্থা নিতান্তই অবাঞ্ছিত। অবাঞ্ছিত বলেই এর যে কোন নিদর্শনের বাস্তবতা দুর্ভাগ্যজনক। এই বাস্তবতার প্রেক্ষাপটটি রাজনৈতিক স্বার্থ, আরো স্পষ্ট করে বলতে গেলে, ক্ষমতা দখলের রাজনৈতিক স্বার্থতাড়িত নষ্ট মানসিকতার দ্বারা পরিপুষ্ট। বাঙালিত্বের, বাঙালি জাতির মহাপরিচয়ে যে ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র ও মানবিক সাম্যের মূলনীতিকে আশ্রয় করে বাঙালি নির্মাণ করেছিলো তার রাজনৈতিক সত্তার মূর্তরূপ স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র, বাঙালির রাষ্ট্রের সেই মৌলিক চরিত্র দুর্ভাগ্যের ঘোর অমানিশায় বিনষ্টির কবলে পতিত হয়। গণতন্ত্রের স্থলে স্বৈরতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতার বদলে ধর্মীয় মৌলবাদ এবং মানবিক সাম্য তথা সমাজতন্ত্রের স্থলে সীমাহীন বৈষম্য রাষ্ট্রের চালিকাশক্তির স্থান দখল করে নেয়। রাষ্ট্রীয় কাঠামোর এই পশ্চাতবর্তী পরিবর্তন বাঙালির ইতিহাসকে পিছিয়ে নিয়ে গেছে তিমিরের দিকে। যে কবির কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছে তিমির বিনাশী গান এই রাষ্ট্র তার অবাঞ্ছিত বিচ্যুতির ধারায় তাঁকেই তিমিরাচ্ছন্ন করার উপকরণ যুগিয়েছে, নজরুলকে খণ্ডিত করার জন্য ধর্মান্ধদের হাতের মৌলবাদের খাঁড়াকে করেছে শাণিত।
অখণ্ড নজরুলকে অনুধাবন ও প্রতিষ্ঠা করতে বাঙালির মনোজগতে বিপ্লবের প্রয়োজন। মানবতাবাদের অমিয়ধারায় সিক্ত গণমুখী সাম্যবাদী ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে তা সম্ভব হওয়া উচিৎ। এ কথা সত্য যে এই রাষ্ট্রীয় কাঠামো অর্জনের জন্য যে সংগ্রাম তার মূল হাতিয়ারও কিন্তু নজরুলেই আছে অর্থাৎ অখণ্ড নজরুলকে প্রতিষ্ঠার জন্য আমাদের নজরুলেই শরণ নিতে হবে। আর এই সত্যে আস্থা রাখতে হবে যে, বাঙালির নজরুলকে খণ্ডিত করা সম্ভব নয়। নজরুল তাঁর বিশ্বাসে, তাঁর সৃষ্টিকর্মে অখণ্ডই আছেন। মনীষী অন্নদা শংকর রায়ের ভাষায়:
ভুল হয়ে গেছে বিলকুল
আর সবকিছু ভাগ হয়ে গেছে
ভাগ হয় নিকো নজরুল।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
Theme Created By Uttoron Host