বাঙালি জাতির হাজার বছরের ইতিহাসে নিজস্ব ভাষা ছিল সংস্কৃতি, সভ্যতা, ইতিহাস, ঐতিহ্য ছিলো। ছিলো না একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। বিগত দুই হাজার কিংবা আরো বেশি ইতিহাস পর্যালোচনা করলে বাংলার একক স্বাধীন স্বত্তার রাষ্ট্রের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনে পুরো বাংলা এক হলেও পরাধীন ছিলো। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ চলে গেলে জন্ম নেয় ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তান। এই দুই পাকিস্তান মিলে জন্ম হয় পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের। পাকিস্তানের অধীনে ২৪ বছর কাটিয়েছি, যা ছিল আর এক নব্য ঔপনিবেশিকতাবাদ। এই দুই যুগের ইতিহাস পশ্চিম কর্তৃক পূর্ব পাকিস্তান তখা বাংলার জনগণের প্রতি চরম শোষন নিপীড়ন, বৈষম্যের জুলুম, অত্যাচার, নির্যাতনের এক ভিবীষিকাময় ইতিহাস। পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক শক্তি কর্তৃক বাংলার রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি, সভ্যতা বিপন্ন করে দেয়।
বাংলার স্বাধীনতার স্বপ্ন হয়তো অনেকেই দেখেছেন হাজী শরীয়তুল্লাহ, শহীদ তিতুমীর, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ইত্যাদি নাম উল্লেখ করা যেতে পারে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানই বাংলা জাতিকে দিয়েছিলেন জাতির সর্ব শ্রেষ্ঠ অর্জন স্বাধীনতা, একটি সার্বভৌম রাষ্ট,্র ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বঙ্গবন্ধুর ডাকে গোটা বাঙালি জাতি বর্বর পাকিস্তান বাহিনীর বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়ে। মুক্তিযুদ্ধ চলে মহান ্ই নেতার নাম তার সংগ্রামী নেতৃত্বে। তিনি আজীবন বাংলার অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য সংগ্রাম করেছেন। জেল, জুলুম, অত্যাচার সহ্য করেছেন। জীবনের প্রায় দেড় শতক কাটিবিয়েছেন জেলের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে। হাজার বছরের বাংলার ইতিহাসে তার মতো আরেক জন বাঙালিকে খুঁজে পাওয়া যাবে না, যে তিনি মানুষকে এত ভালবাসতে পেরেছেন। বঙ্গবন্ধু বাংলার গরীব দুঃখী মানুষের জন্য সব সময় হাহাকার করতেন। তিনি বলতেন আমার জীবনের একমাত্র কামনা বাংলাদেশের মানুষ যেন খাদ্য পায়, আশ্রয় পায় এবং উন্নত জীবনের অধিকার পায়। এ প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার মন্তব্য উল্লেখ আবশ্যক। আমার বাবা শেখ মুজিবুর শীর্ষক এক লেখায় তিনি বলেছেন, আমার হাতের তালুতে মুখ রাখলে দেখতে পেতাম বাংলাদেশ ও তার প্রিয় জনগণ। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়ার নিভৃত পল্লীর সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন ১৯২০ সালের ১৭ ই মার্চ। মধ্যরাতের সূর্য তাপস গ্রন্থ সূত্রে জানা গেছে, ১৪৬৩ সালে ওলিয়ে কামেল হযরত বায়েজিদ বুস্তামী (রঃ) এর সঙ্গে থেকে এক সহচরের বঙ্গীয় এলাকায় দরবেশ শেখ আব্দুল আউয়াল এর আগমন। তিনি বঙ্গবন্ধুর পূর্ব পুরুষ। গীমাডাঙ্গা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ৫ম শ্রেণী পাশ করেন। গোপালগঞ্জ পাবলিক স্কুল থেকে এস.এস.সি পাস করেন। এরপর ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় ছাত্র জীবন শুরু হয়। ১৯৪৮ সালে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হন এবং সেখান থেকে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন কনে। ১৯৩৯ সালে বাংলার তৎকালীন প্রধান মন্ত্রী শেরে-ই বাংলা ফজলুল হক ও প্রখ্যত রাজনীতিবিদ হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সান্যিধ্যে রাজনৈতিক দিক্ষা লাভ করেন। ১৯৪৮ সালের ৪ ঠা জানুয়ারী বঙ্গবন্ধু মুলিম ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠা করেন। পরে বঙ্গবন্ধুর প্রস্তাবক্রমে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করেন। ১৯৫২ সালের ২৬ শে জানুয়ারি খাজা নাজিমুদ্দিন ঘোষণা করেন পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দূ। তিনি জেলখানা থেকে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে আন্দোলনের ডাক দিলে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে ১৪৪ ধারা জারি করলে মিছিলে পুলিশ গুলি চালালে রফিক, শফিক, বরকত, সালাম শহীদ হন। ২৬ শে ফেব্রুয়ারী বঙ্গবন্ধু মুক্তি লাভ করেন। ১৯৫৩ সালে আওয়ামী মুসলিমলীগ গঠন করেন। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে বিজয় লাভ করেন। ১৯৫৫ সালে বঙ্গবন্ধু জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৬৬ সালে ৬ দফা পেশ করেন। ১৯৬৯ সালে গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দান করেন। ১৯৭০ সালে নিরাঙ্কুস সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করেন। ১৯৭১ সালের ৭ ই মার্চ রেসকোর্সের জনসমুদ্র থেকে বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেন ‘‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’’ ঐতিহাসিক ভাষণে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বাঙালি জাতির শৃঙ্খল মুক্তির আহবান জানিয়ে ঘোষণা করেন রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরো দিব, এদেশের মাটিকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশো আল্লাহ। প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল। যার যা আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে। ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি করে মেহেরপুরের মুজিবনগরে সরকার গঠিত হয়। এরপর শুরু হয় দীর্ঘ ৯ মাস মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধে জয়লাভ করে সুজলা, সুফলা, শস্য শ্যামলা, স্বাধীনতা-সার্বভৌম বাংলা নামক এক রাষ্ট্রের পতাকা এনে দিলো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের মহান স্থপতি, জাতির পিতা। ২০০৪ সালে বিবিসর শ্রোতা জরিপে বঙ্গবন্ধুকে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে। ইতিহাসে বঙ্গবন্ধুর জীবন দর্শন, সক্রেটিস, এরিষ্টটল, রুশো ও প্লেটোর মতো বিশ^ বরেন্য দার্শনি দের ছাড়িয়ে যাবেন। বঙ্গবন্ধু নিজে একাই একটি সভ্যতার জনক। ৩০ লক্ষ মা-বোনের সাগর সম রক্তে শেখ মুজিব এনেছেন ‘‘স্বাধীনতা নামক সভ্যতা, বাংলাদেশ নামক সভ্যতা, গনতন্ত্র বা স্বাধীনতার জন্য বিশে^র আর কোন দেশ এতো রক্ত দেয়নি যা বিশ^ইতিহাসের এক অনন্য নজির। এই ত্যাগ ও বীরত্বের শ্রেষ্ঠ শেখ মুজিব। মুজিব মূর্তপ্রতীক। তিনি বাঙালির মুখে তুলে দিয়েছিলেন জয় বাংলার মতন কালো জয়ী উজ্জীবনী স্লোগান। কিন্তু আন্তার্জাতিক সহযোগিতায় স্বাধীনতা বিরোধী কুচক্রী মহলের ষড়যন্ত্রে¿ বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন থামিয়ে দেওয়া হয়। ১৯৭৫ সালের ১৫ ই আগস্ট রাতে তাকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করা করানো হয়। এরপর ৩ রা নভেম্বর জেলখানায় জাতীয় চার নেতাকে নির্মমভাবে হত্যা করে জাতীয় নেতৃত্ব শূন্য করা হয়।
বাংলাদেশ আর বাংলাদেশের মানুষের জন্য শুধু তার নিজের জন্য নয়। ইতিহাসে স্বদেশের জন্য এত বড় নজির আছে কিনা সন্দেহ। বহু রক্ত দিয়েছি প্রয়োজন হলে আরও রক্ত দিব, শেখ সাহেবের উক্তিটি নিজেই সত্যে পরিণত করে গেলেন। জাতির জনকের হত্যার পর দেশ পরিনত হয় অন্ধকারে সভ্যতা, মানবতা, গণতন্ত্র বিপন্ন হয়।
পরিশেষে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে মূল্যায়ন করতে গিয়ে আমেরিকার তিন জন নেতার অবদান উল্লেখ করছি। জর্জ ওয়াশিংটন আমেরিকাকে স্বাধীনতা দিয়েছেন, জন আবরাহাম লিংকন এনেছেন গণতন্ত্র, মার্টিন লুধারকিং জাতিকে সভ্যতা দিয়ে এই তিন নেতা বিশ^ নন্দিত হয়েছেন। কিন্তু আমাদের মহান নেতা জাতিকে ‘‘স্বাধীনতা’’ ‘‘গণতন্ত্র’’ ও সভ্যতা এনে এই তিন সম্পদ দান করেছেন। তাই বাঙালির হাজার হাজার বছরের ইতিহাস বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানই সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি। সোনার বাংলার সোনার মানুষ।
প্রফেসর কাওসার আলম মিঠু,
বিভাগীয় প্রধান,
ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ,
কবিরাজপুর ছইফউদ্দিন ডিগ্রি কলেজ,
কবিরাজপুর, রাজৈর, মাদারীপুর।