শনিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২২, ০৬:২৯ অপরাহ্ন
নোটিশ
যে সব জেলা, উপজেলায় প্রতিনিধি নেই সেখানে প্রতিনিধি নিয়োগ দেয়া হবে। বায়োডাটা সহ নিউজ পাঠান। Email: [email protected]

হংকং চীনের কাছে কেমন আছে

Reporter Name
Update : বুধবার, ৬ জুলাই, ২০২২, ১০:০৬ পূর্বাহ্ন

হংকং ব্যাপক স্বায়ত্তশাসন, ব্যক্তি অধিকার ও বিচারিক স্বাধীনতা ভোগ করবে। ২৫ বছর আগে ১৯৯৭ সালে হংকংকে এ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল চীন। সে বছর যুক্তরাজ্যের কাছ থেকে ৫০ বছরের জন্য (২০৪৭ সাল পর্যন্ত) হংকংয়ের নিয়ন্ত্রণ পায় চীন। যুক্তরাজ্যের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী, হংকংয়ে ‘এক দেশ, দুই নীতি’ বাস্তবায়ন করা হয়েছিল। ২৫ বছর পর চীনের দেয়া সেই প্রতিশ্রুতি কতটা উপভোগ করতে পারল হংকং? বাকি ২৫ বছর চীন তার অঙ্গীকার কতটা বাস্তবায়ন করতে পারবে? এ নিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোতে আলোচনা-বিশ্লেষণ চলছে।

চীনের হাতে পড়ার পর বড় রাজনৈতিক পরীক্ষায় পড়ে হংকং। অনেকের উদ্বেগ ছিল, কমিউনিস্ট চীনা শাসনের অধীনে পুঁজিবাদি ও ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে আলাদা হওয়া হংকং কীভাবে মানিয়ে চলবে। আবার কেউ কেউ আশা করেছিল, হংকংয়ের গণতন্ত্র রক্ষায় চীন অনেক বেশি উদার থাকবে।

নিয়ন্ত্রণের ২৫ বছর পর এখন সমালোচকরা বলছেন, বেইজিং তার প্রতিশ্রুতি থেকে সরে এসেছে। এর কারণ হিসেবে হংকংয়ে নিরাপত্তা আইন চালু ও নির্বাচনী সংস্কারকে দায়ী করেছেন তারা।

২০১৪ সালে সর্বজনীন ভোটাধিকারের দাবিতে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে হংকং। ‘আমব্রেলা মুভমেন্ট’ নামে ওই বিক্ষোভ টানা ৭৯ দিন চলে। তারপর থেকে মূলত বেইজিং হংকংয়ের ওপর অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ আরোপের চেষ্টা করেছে। বেইজিংয়ের এই দৃঢ়তা হংকংয়ের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ে।

২০১৯ সালে হংকংয়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়। ২০২০ সালে বিক্ষোভ দমাতে নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন করে চীন। এ আইন কার্যকর হওয়ার পর হংকং অনেকটা শান্ত হয়ে যায়। হংকং থেকে পালিয়ে যান গণতন্ত্রপন্থী নেতা টেড হুই। তার অভিযোগ, হংকংয়ের বেশিরভাগ মানুষ মনে করেন, এক দেশ দুই নীতি বিলীন হয়ে গেছে।

বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিরাপত্তা আইনের কারণে হংকংয়ে অনেক রাজনৈতিক সংগঠন ভেঙে গেছে। শহরটির গণতন্ত্রপন্থি কর্মী ও রাজনীতিকদের জেলে বা নির্বাসনে পাঠানো হয়েছে। হাজার হাজার হংকংয়ের বাসিন্দা যুক্তরাজ্য, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২২ সালের মার্চ পর্যন্ত ব্রিটিশ নাগরিকত্বের জন্য প্রায় দেড় লাখ আবেদন জমা পড়েছে।

হংকংয়ের বেশ কয়েকটি সংবাদপত্র যেমন ‘অ্যাপল ডেইলি’ ও স্ট্যান্ড নিউজ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এশিয়ায় গণমাধ্যমের স্বাধীনতায় হংকংয়ের অবস্থান এ বছর ৭০ ধাপ পিছিয়ে ১৪৮তম অবস্থানে দাঁড়িয়েছে।

গত ১ জুলাই চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং হংকং সফর করেন। এ বছর তার সফরকে ঘিরে হংকংয়ে কোনো বিক্ষোভ হয়নি। অথচ এ দিনে গত পাঁচ বছর আগে (২০১৭ সাল) তার হংকং সফরের সময় হাজার হাজার মানুষ বিক্ষোভ করেছিল।

হংকংয়ের নিয়ন্ত্রণ হস্তান্তরের ২৫তম বার্ষিকীতে চীনা প্রেসিডেন্ট বলেন, হংকং শাসনের ক্ষেত্রে ‘এক দেশ, দুই ব্যবস্থা নীতি’ বজায় থাকবে। এটি পাল্টানোর কোনো কারণ নেই। এটি দীর্ঘমেয়াদে বজায় রাখতে হবে। এ আইন হংকংয়ের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার সহায়ক। সমালোচকদের মতে, হংকংয়ে ‘এক দেশ, দুই নীতি’ চীন পরীক্ষামূলকভাবে চালু করেছে। এটিতে আশানুরূপ ফল পেলে তারা তাইওয়ানের ওপর এ নীতি প্রয়োগ করবে।

তবে হংকংয়ের শেষ ব্রিটিশ গভর্নর ক্রিস প্যাটেনসহ অনেক সমালোচক শির বক্তব্যের সমালোচনা করে বলছেন, হংকংয়ের ওপর বেইজিং দখলদারিত্ব করছে। তারা প্রতিশ্রুতির ব্যতিক্রম করছে। প্যাটেনের মতে, প্রথম ১০ বছর অর্থাৎ ১৯৯৭ সালের পর হংকংয়ের পরিস্থিতি ঠিকঠাক ছিল। কিন্তু তারপর এর অবস্থার অবনতি ঘটেছে। এর কারণ হিসেবে শি জিনপিং ও তার নেতৃত্বও দায়ী। প্যাটেন বলেন, হংকংয়ের অবস্থা নিয়ে আমরা আতংকিত।

ক্ষমতায় আসার পর থেকে শি পশ্চিমা ভাবধারা গণতন্ত্র, সংবাদপত্রে স্বাধীনতা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও সর্বজনীন মানবাধিকারের মতো বিষয়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে আসছেন। কিন্তু এই ভাবধারা লালন করে আসছে হংকং। পশ্চিমাদের অভিযোগ, হংকংয়ের গণতন্ত্রের চাওয়া ভালো ভাবে দেখে না বেইজিং।

বেইজিংয়ের কারণে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে হংকং আবেদন হারাচ্ছে। ২৫ বছর আগে হংকংয়ের অর্থনৈতিক অবস্থা চীনের চেয়ে অনেক উন্নত ছিল। হংকংয়ে গত ৪-৫ বছরে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের আঞ্চলিক সদর দফতর প্রায় ১০ শতাংশ কমেছে। অন্যদিকে চীনা প্রতিষ্ঠাগুলো ২৭ শতাংশ বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেডিট রেটিং এজেন্সি এস অ্যান্ড পি গ্লোবাল রেটিংসের এশিয়া প্রশান্ত মহানগারের প্রধান অর্থনীতিবিদ লুইস কুজিস বলেন, হংকংয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কমছে। আর চীনা বাণিজ্য বাড়ছে। অথচ হংকং আন্তর্জাতিকভাবে সমন্বিত একটি শহর। আন্তর্জাতিক বাজারে এর আলাদা ও উন্মুক্ত অবস্থান রয়েছে। অনেক শহর অর্থনৈতিকভাবে যুক্ত রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক হংকং ডেমোক্রেসি কাউন্সিলের নীতি ও গবেষণা বিষয়ক ফেলো জেফরি এনগো মনে করেন, অদূর ভবিষ্যতে হংকংয়ে বড় ধরনের কোনো বিক্ষোভ হবে না। কারণ ২০২০ সালের পর অনেকেই কারাগারে আছেন। কেউ কারাগার থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করছে। কেউ ভালো থাকার জন্য কিছু বলছে না।

একই ইঙ্গিত দিয়ে বেইজিং সমর্থিত আইনপ্রণেতা ডমিনিক লি জানান, হংকংয়ের নতুন প্রজন্ম দেশপ্রেমিক হবে। তার সন্তানকে দেখেই তিনি তা বুঝতে পেরেছেন। তিনি মনে করেন, এই প্রজন্মের ২০১৯ সালের মতো রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করার মতো অনুভূতি নাও থাকতে পারে।

বেইজিং সমর্থকদের মতে, শির হাত ধরে হংকং স্থিতিশীলতা, সমৃদ্ধি ও উন্নয়নের পথে রয়েছে। হংকং শহর কর্তৃপক্ষ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, গত আড়াই দশকে হংকংয়ের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য আমাদের একান্ত আত্মবিশ্বাস ও প্রত্যাশা রয়েছে। শির সফর গোটা জাতি ও হংকংয়ের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।

প্রসঙ্গত, দেড়শ বছরের শাসনের পর ১৯৯৭ সালে হংকংকে চীনের কাছে ফিরিয়ে দেয় যুক্তরাজ্য। কিন্তু এই দীর্ঘ শাসনের সময় ভূখণ্ডটিকে উপনিবেশ হিসেবে উল্লেখ করেছে ব্রিটিশ সরকার।

চীন সবসময়ই অঞ্চলটিকে নিজেদের ভূখণ্ড বলে দাবি করেছে। বেইজিং জানায়, ১৮০০ সালের দিকে অন্যায়ভাবে আফিম যুদ্ধ চুক্তির কারণে ব্রিটিশদের কাছে হংকংয়ের দখল ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছিল তারা।

বেইজিংয়ের মতে, ১৮৪২ সালের পর ব্রিটিশরা কেবল অঞ্চলটি দখল করেছিল। তখন ব্রিটিশদের সঙ্গে বেশ কয়েকটি চুক্তি সই করে তখনকার কিং সরকার। এতে নিজেদের ভূখণ্ডের কয়েকটি অংশ ব্রিটিশদের কাছে তারা ইজারা দিয়েছিল। চীনের যুক্তি হলো, জবরদস্তিমূলক ওইসব চুক্তি সই হয়েছিল। যা চীনারা কখনোই মানেনি।

১৯৯৭ সালে হস্তান্তরের পর বেইজিংকে মেনে নেয় হংকং সরকার। তারা কখনোই বলেনি যে, কেন সার্বভৌমত্ব চীনের কাছে হস্তান্তর করা হলো। বরং বলছে, হংকং তার মাতৃভূমিতে ফিরে এসেছে।

হংকংয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে চীনা পরিচয়ের অনুপ্রবেশ ঘটাতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অনেকগুলো কার্যক্রম হাতে নিতে দেখা গেছে বেইজিং সরকারকে। হংকং সবসময়ই চীনের অংশ ছিল বলে ধারণা প্রতিষ্ঠা করতে চায় বেইজিং সরকার।

অনেকের আশঙ্কা, আগামী ২০৪৭ সালের মধ্যে হংকং ও চীনবাসী এক হয়ে যাবে। তাদের সহজে আলাদা করা কঠিন হয়ে যাবে।

বিবিসি-সিএনএন অবলম্বনে


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published.

More News Of This Category
Theme Created By Uttoron Host