কবি রফিক রেজা: শৈলকুপা জনপদ ধনে জ্ঞানে যেমন সমৃদ্ধ সামাজিক অপরাধের দুষ্টচক্রের প্রভাব তেমনি এখানে প্রবল। এই এলাকার একটি সামাজিক কোন্দলের নাম কাইজা ।আবহমান কাল থেকে গড়াই, কুমার আর কালী নদী বিধৌত এই উর্বর জনপদে কাইজা নামক সামাজিক কোন্দলের ঘটনা ঘটে আসছে।
এ সকল মারামারির মধ্যে কোন কোনটির কাহিনী চরিত্র ও ঘটনা বিন্যাস কখনও কখনও কবিতা কিংবা গানের শিল্পরূপ হয়ে শোক গাঁথা কিংবা লোকগাঁথায় পরিণত হয় এবং মানুষের কাছে নান্দনিক খোরাকের উপজীব্য হিসেবে কালের পর কাল টিকে থাকে।আজ আমি যে ঘটনার অবতারণা করছি তা কবি জসিম উদ্দিনের নকশী কাঁথার মাঠ কাহিনীকাব্যের রুপাই সর্দারের বীরগাঁথা কাহিনীর সাথে তুলনীয় তবে আরও বিয়োগাত্মক এবং নায়কের করুণাত্মক পরিণতির বাস্তব উপাখ্যান।
কিয়াম ও সিয়াম ওরফে রমজান সর্দার। বাড়ি শৈলকুপার বড়দা গ্রামে। গায়ের শক্তি বুনো মহিষকে হার মানায়। তার সর্দারী নামের পরিচিতি শৈলকুপা থানার বাইরেও ছড়িয়ে ছিল।সর্দারী শুধু পেশা নয় এ যেন নেশা ;তাই নিজ এলাকার বাইরেও কাইজে করতে যেতেন হায়ারে। লোকশ্রতি আছে তার সামনে দাড়ানোর মতো বীর তৎসময়ে ছিল না বললেই চলে, কেননা জনশ্রুতি আছে তিনি কালী সাধন করে কাজেই নামতেন। কিন্তু বিধি বাম, সেই সাধনেই ভুল । সন বাংলা ১৩৫৫ , ২৫ শে কার্তিক। ডাক পড়ল কালী নদীর পাড়ে জেগে ওঠা শীতালীডাঙার চর দখলে যেতে হবে।চরের অবস্হান শেখ পাড়া নিকটবর্তী শীতালীডাঙ্গা হলেও জমি দাবী করে উত্তর বোয়ালিয়া মৌজাধিন রতিডাঙ্গ গ্রামবাসী। কাইজের দিন পড়ল বৃহস্পতিবার রতিডাঙার পক্ষে হাতেম আলী সর্দারসহ আরও অনেকে। শিতালীডাঙা – শেখপাড়ার পক্ষে সিয়াম সর্দার , রমজান সর্দার , একদিল সর্দার প্রমূখ।রাতে কালী নদীতে নৌকা বেধে পথ তৈরি করল হাতেম আলী সর্দারের লোকজন। ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই উভয় পক্ষ স-দলবলে হাজির হলো চরে ।কাইজে দেখতে হাজির হলো শত শত মানুষ। কবিয়াল ধনাউল্যাহর কন্ঠে-
১৩৫৫ সালের ২৫ শে কার্তিক সকাল ৭ টায় কাইজে শুরু হয়
সেই কাইজেতে মারা গেল কিয়াম সর্দাররা জোড়া ভাই – আহারে কি দারুণ বিধি দ্যাশের লোক করছে হায় হায়!!
মিয়া যাত্রা করে কাজেই গেল , সাধনেতে ভুল পড়িল , মরা মূর্তী সামনে দেখতে পায়।
তাই দেখিয়া অবাক হয়ে রমজান আলী ডেকে কয়-
চল- চল প্রাণের ভাইজান আজ বাড়ি ফিরে যায়।।
হাতেম আলীর বুদ্ধি হত , বসে বসে ভাবছে শত
রমজান আলীর মুখে কথা নাই।
পরে একদিল সর্দার ডেকে বলে ফিরে যাওয়াতো উচিত নয়; আজকের মতো চল সবে আমরা চরের উপর যায়।
হায় ওরে বিধির কি হইল-
শুনে একদিলের মুখের বাণী
কিয়াম সর্দার যেন ভাবে রব্বানী
কোমর বান্ধিয়া খাড়া হয়।
ওরে মা মা বলে ডাক ছাড়িয়া
চরের উপর হাইটো দেয়-
আহারে বিধির কি হইল।
কোথায় ছিলেন শত্রু হন্তা
সামনে এসে খাড়া হয়; ও কাইজে শুরু হইল।।
কাইজে যখন শুরু হইল
কিয়াম সর্দার আগে ছিল
পেছন থেকে সকলে পালায়-
কোপাকুপি শুরু হইল
শত্রু চারদিকে ঘিরিয়া ধরল
পাশে দাড়াইয়া ছিল কিয়াম সর্দারের ছোট ভাই
ও বিধির কি হইল-
শত্রু সামনে পড়িল যত
ঢাল কাটিল ইচ্ছে মত
সুযোগ পেয়েও করল না হত
ও যে সর্দারী নীতি কয়।
কিন্তু পেছন থেকে শত্রু এসে
অস্ত্রে আঘাত করল শেষে
ফালা মারিল মিয়ার গায়
রমজান আলী ঢাল ফেলিয়া
হাত জোড় করে দাড়া ইয়া
বলিল- ভাই ধরি আপনাদের পায়
মেরো না মেরো না আমার জোড়ের ভাই
ও বিধির কি হইল-
ও কথা বলতে বলতে শত্রু
আঘাত করিল রমজানের গায়
ও সে বুকের উপর ফালা মাইরে জমিনে চিৎ করে ফেলায়– মরিল মরিল জোড়া ভাই
চরের উপর একি হইল হায়।।
আরে দুই ভাই যখন মারা পড়ল
বড়দা গ্রামে খবর গেল
দেখতে সবে তাড়াতাড়ি যায়
ও মিয়ার ভাই বেরাদার যতই ছিল সকলে কান্দে হায়রে হায়!
এমন শত্রু কোথায় ছিল খুন করিল জোড়া ভাই? আহারে বিধির কি হইল।।
থানায় এবার সংবাদ গেল
দারোগা বাবু এসে পড়ল
ও লাশ ঝিনেদাতে চালান হয়।
ওরে সরকারি ডাক্তার এসে তারে
দিল কলিজা নিয়ে যায়
কিয়ামের দিল কলিজা আড়াই সের ও হয়। [চলমান]