ইউক্রেনে আগ্রাসন চালানোর জন্য রাশিয়ার অর্থনীতিকে ধ্বংস করে দেয়ার অর্থ হতে পারে গুরুত্বর। যুক্তরাষ্ট্র ও এর মিত্রদের জন্য অপ্রত্যাশিত ফল বয়ে আনতে পারে এই প্রচেষ্টা। অনলাইন দ্য হিল-এ এসব নিয়ে একটি প্রতিবেদন লিখেছেন সিলব্যান লেইন। তিনি আরও লিখেছেন, বিস্ময়কর গতিতে রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, বৃটেন, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ও তাদের অংশীদাররা। এতে খুঁড়িয়ে চলা শুরু করেছে রাশিয়ার অর্থনীতি। এরই মধ্যে বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থা থেকে রাশিয়া সরকার ও তাদের বড় বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ডজন ডজন আন্তর্জাতিক কোম্পানি রাশিয়া থেকে নিজেদের গুঁটিয়ে নিয়েছে। রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংক যখন গভীর সঙ্কট প্রতিরোধে তৎপর, তখন দেশটির মুদ্রা রুবলের দামের ভয়াবহ পতন হয়েছে। কমপ্লায়েন্স প্রতিষ্ঠান কে২ ইন্টিগ্রিটি আয়োজিত বৃহস্পতিবারের ওয়েবিনারে যোগ দিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারির সাবেক আর্থিক অপরাধ বিষয়ক সহকারি সেক্রেটারি ডানিয়েল গ্লাসার।
ইউক্রেনে আগ্রাসনের জন্য রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন যাতে তার নিজের দেশের মধ্যে অত্যাবশ্যক শাস্তি পান, অর্থনৈতিক ক্ষতি খুব বেশি হয়- এ বিষয়ে একমত যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা। রাশিয়ার অর্থনীতিকে শুধু ক্ষতিগ্রস্ত করতে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে এমন নয়। একই সঙ্গে তা যেন মস্কোর আর্থিক বেদনাকে সহ্য করা সীমিত করে। সেন্ট্রাল ব্যাংক অব রাশিয়ার সঙ্গে সব রকম লেনদেন বন্ধ করে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা। তারা একই সঙ্গে বৈদেশিক রিজার্ভ হিসেবে প্রায় ৬০,০০০ কোটি ডলারের অর্ধেক জব্দ করেছে। এসব অর্থ অন্য দেশগুলোতে জমা করেছিল মস্কো। বিশেষজ্ঞরা বলেন, এর মধ্য দিয়ে পুতিনের যুদ্ধের ক্ষমতাকে লক করে দেয়া হয়েছে।
ভবিষ্যতে শাস্তির ভয়ে আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলো রাশিয়া থেকে গণহারে চলে যেতে থাকবে। নিষেধাজ্ঞার বাইরে থাকা ডজন ডজন কোম্পানি তাদের কর্মকাণ্ড রাশিয়ায় চালাতে পারতো। কিন্তু তারা যুক্তরাষ্ট্র সরকারের নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি এড়াতে, মার্কিন ডলারের সুবিধা হারানোর ভয়ে রাশিয়া ত্যাগ করছে। রাশিয়ার সামগ্রিক অর্থনীতি বিষয়ক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান জেইমবা ইনসাইটসের প্রতিষ্ঠাতা র্যাচেল জেইমবা ওইসব কোম্পানি সম্পর্কে বলেছেন- সুনির্দিষ্ট কিছু হাতিয়ার আছে, যা তারা ব্যবস্থাপনায় ব্যবহার করতে পারে। তারা একটি মন্দার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। তাতে দৃষ্টি দেয়া হয়েছে অর্থনীতিতে। গত কয়েক দশকে যে সংস্কার করা হয়েছে, তার সবটাই এতে নষ্ট হয়েছে। তবে অর্থনীতির এই ক্ষত সত্ত্বেও ইউক্রেনে পুতিনের সামরিক উচ্চাকাঙ্খাকে দমাতে পারেনি।
রাতারাতি ইউক্রেনের, তথা ইউরোপের সবচেয়ে বড় পারমাণবিক বিদ্যুত কেন্দ্র জাপোরোজিয়ার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়েছে রাশিয়ান বাহিনী। এতে মার্কিন কর্মকর্তাদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। ওই বিদ্যুতকেন্দ্রে হামলার পর তাতে আগুন ধরে যায়। এ ঘটনায় বিশ্বজুড়ে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। ফলে রাশিয়ায় পুতিন শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আরো আগ্রাসী পদক্ষেপ নেয়ার জন্য মার্কিন আইনপ্রণেতাদের মধ্য থেকে চাপ সৃষ্টি হয়। রাশিয়ার তেল বন্ধ করে দিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের ওপর চাপ সৃষ্টি হয় মার্কিন কংগ্রেসের উভয় দলের পক্ষ থেকে। যদি সেটা করেন বাইডেন, তাহলে তাতে বিশ্বে গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি পাবে। কারণ, বিশ্বে প্রাকৃতিক তেলের সঙ্গে এই মূল্য সম্পর্কিত।
যুক্তরাষ্ট্র তেলের বড় কোনো রপ্তানিকারক নয়। সেখানে অশোধিত ক্রুডের চাহিদা তুঙ্গে। এর ফলে ইউরোপিয়ান মিত্ররা যদি রাশিয়ার পেট্রোলিয়াম এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের বিকল্প খোঁজে তাতে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি মূল্য বেড়ে যাবে। বাইডেন যখন দেশের ভিতরে মার্কিনিদেরকে একটি সম্ভাব্য আর্থিক মন্দা সম্পর্কে প্রস্তুত হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন, তখন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাশিয়াকে অপ্রত্যাশিত শাস্তি দেয়ার ফলে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতেও অপ্রত্যাশিত ঝুঁকি সৃষ্টি করবে। এ অবস্থায় মার্কিনিরা তাদের জ্বালানি এবং খাদ্যমূল্যে খুব দ্রুততার সঙ্গে হতাশা অনুভব করবে, বিশেষ করে জো বাইডেন যদি রাশিয়ার তেল আমদানির বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেন। গোল্ডম্যান স্যাচে’র অর্থনীতিবিদদের মতে, দু’সপ্তাহ ধরে ক্রুড তেলের দাম শতকরা প্রায় ২০ ভাগ বেড়ে গেছে। যার ফলে মার্কিন মোট জাতীয় প্রবৃদ্ধি শতকরা ০.২ ভাগ পতনের জন্য যথেষ্ট। এর ফলে বাড়বে নিত্যপণ্যের মূল্য। বাড়বে পরিবহন খরচ। কারণ, এসব ঘটনায় শিপিং বা চালান স্থানান্তর বিঘ্নিত হবে। জেইমবা বলেন, রাশিয়ার তেল আমদানি বন্ধ করার অর্থ হবে প্রতীকী। এতে অন্য বাজারে চলে যাবে বহু ব্যারেল তেল। এক্ষেত্রে আমরা কস্ট-বেনিফিট বিশ্লেষণ করে বলতে পারি- আমার কাছে এটা পরিষ্কার নয় যে, রাশিয়াকে দেয়া শাস্তি বা বেদনা দিয়ে এই বেদনাকে ন্যায্যতা দেয়া যায়।