রবিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০১:৪২ অপরাহ্ন
নোটিশ
যে সব জেলা, উপজেলায় প্রতিনিধি নেই সেখানে প্রতিনিধি নিয়োগ দেয়া হবে। বায়োডাটা সহ নিউজ পাঠান। Email: [email protected]

নড়াইলের কালের সাক্ষী রাসমনির কাছারি বাড়ি

রেজাউল হক নড়াইল জেলা প্রতিনিধি
Update : সোমবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২১, ২:১০ অপরাহ্ন

রেজাউল হক, নড়াইল জেলা প্রতিনিধিঃ  দুই শতাধিক বছর আগে নির্মিত নড়াইলের কালিয়া উপজেলার নড়াগাতিতে রানী রাসমনির কাছারি বাড়িটি ইংরেজদের দূঃশাসন ও নির্যাতনের স্বাক্ষী হয়ে আজও দাড়িয়ে আছে।  অযত্ন ও অবহেলায় এখন ধ্বংশের দ্বার প্রান্তে উপনীত হয়েছে সরকারের নিয়ন্ত্রনাধীন ওই বাড়িটি। ইতিহাসের সাক্ষী ওই বাড়িটির তৎসংলগ্ন মন্দিরটি সংরক্ষণসহ পর্যটন সমৃদ্ধ করে তোলার দাবী তুলেছেন স্থানীয়রা।

        ১৮’শ সালের গোড়ার দিকে ভারতবর্ষে তখন ইংরেজ দূঃশাসন পুরোপুরি জেকে বসেছে। পরাধীন বাঙালীর কাছ থেকে কর-খাজনা আদায়সহ নীল চাষ বাস্তবায়নে মেতে উঠে ইংরেজ বেনিয়ারা। তৎকালিন যশোর জেলার একটি পরগনার নাম ছিল মকিমপুর। পরগনাটি শাসন করতেন রানী রাসমনি। বর্তমান নড়াইল জেলার কালিয়া উপজেলা নড়াগাতিসহ জমিদার শিশির কুমার রায়ের জমিদারির অন্তরভূক্ত ছিল। কর-খাজনা আদায়সহ জমিদারের শাসনকাজ পরিচালনার জন্য কালিয়া উপজেলার মধ্যবর্তী স্থান হিসেবে আঠারোবাকি নদীর পাড়ে নড়াগাতিতে ১৮১২ সালে রানী রাসমনি ৪ একর ৪৯ শতক জমির ওপর ৮০ ফুট লম্বা ও ৫৫ ফুট চওড়া সুদর্শন কাছারি ভবন ও একটি দৃষ্টিনন্দন মন্দির নির্মাণ করেছিলেন। প্রজা নির্যাতন ও ইংরেজ দূঃশাসনের নীরব স্বাক্ষী হয়ে আজও দাড়িয়ে আছে সেই কাছারি বাড়িটি। কিন্তু কারুকার্য খোচিত বাড়িটিতে পরগাছা জন্মে এখন আর সেই সৌন্দর্য  নেই। তবে নীরবে দাড়িয়ে দুশো বছরের ইংরেজ দূঃশাসন ও নির্যাতনের কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে বর্তমান প্রজন্মকে।
        কাছারির নায়েবসহ পাইক-পেয়াদা ও নীলকরদের নিরাপত্তা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে ১৮১৫ সালে কাছারির অদুরে বর্তমান কালিয়া উপজেলার গ্রামগুলো নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় নড়াগাতি থানা। যদিও তখন রানীর শাসন ব্যবস্থা ছিল কাছারি কেন্দ্রিক। বর্তমান নড়াইল জেলার পূর্বাঞ্চলে ইংরেজ নীলকর বেনিয়া ও জমিদারের নায়েবদের নির্যাতন ও জুলুমের প্রধান ঘাটি হিসাবে বিবেচিত ওই কাছারিটি বহু মানুষের ওপর নির্যাতন ও জুলুমের কথা স্থানীয়দের জানান দিয়ে চলেছে। বাড়িটি এখন  অযত্ন ও অবহেলায় এখন ধ্বংশের দ্বার প্রান্তে এসে দাড়িয়েছে। তার জ্বানালা,দরজাসহ বহু মূল্যবান জিনিষপত্র ইতিমধ্যেই চুরি হয়ে গেছে। শূন্য ভবনটি দাড়িয়ে দাড়িয়ে গুনছে ধ্বংশ স্তুপে পরিনত হওয়ার প্রহর। সেই সুযোগে রোদ বৃষ্টিতে গরু ছাগলের নিরাপদ আশ্রয়স্থলে পরিনত হয়েছে ইতিহাস খ্যাত রানী রাসমনির কাছারি বাড়িটি। প্রজাদের খোজ খবর নিতে এসে  সেখানে রানী একাধিক বার রাত্রীও যাপন করেছেন।
        স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা গেছে, কাছারি বাড়িটি নির্মাণের পর প্রজাদের কাছ থেকে কর-খাজনা আদায়ে যেমন চাপ বাড়তে থাকে, অপরদিকে চতুর পাশে ইংরেজরা ১২ টি নীল কুঠি স্থাপন করে নীল চাষে বাধ্য করতে এলাকার কৃষকদের ওপর শুরু করে অমানুষিক  নির্যাতন। নীলচাষে অবাধ্য প্রজাদের ওপর শুরু হয় অমানুষিক নির্যাতন। আর কর-খাজনা আদায়েও কঠোর অবস্থানে ছিলেন রানীর নায়েব শশীভূষন। তার কথার অবাধ্য হলে তার নিস্তার ছিল না। প্রজাদের ধরে নিয়ে বাড়িতে আটকে চালানো হতো নির্যাতন। আর শশীভূষনের নির্যাতনে অনেককেই জীবন দিতে হয়েছে বলে জনশ্রুতি রয়েছে। তবে নায়েব শশীভূষন ও তার পাইকদের নির্যাতনে যাদের জীবন দিতে হয়েছিল,তাদের লাশের শেষ পরিনতি কি হয়েছিল তা আজও কেউ বলতে পারে না। তবে যতদুর জানা গেছে,তাদেরকে নির্যাতনে হত্যার পর মরদেহ গায়েব করেছিল শশীভূষন। নির্যাতনের প্রতিবাদ করায় রানীর নায়েব ও ইংরেজ নীলকরদের হাতে যারা জীবন দিয়েছেন তাদের মধ্যে রয়েছেন,বর্তমান কালিয়া উপজেলার গাজীরহাট গ্রামের কালু খা, বাঐসোনা গ্রামের মোল্যা তমিজদ্দিন, মধুপুর গ্রামের রাঙ্গা মিয়াসহ কয়েকজন বলে জনশ্রুতি রয়েছে।
        ভবনের পাশেই রয়েছে কারুকার্য খচিত একটি মন্দির। সেটিও এখন ক্ষয়ে ক্ষয়ে ধ্বংসস্তুপে পরিনত হতে চলেছে। সরকারের অর্পিত সম্পত্তির তালিকাভূক্ত ওই বাড়িটির চার পাশে থাকা সরকারি সম্পতিও নানা ভাবে বেদখল হয়ে যাচ্ছে। সে গুলো রক্ষায়  কোন তৎপরতা নেই কারোর। মনে হচ্ছে সরকার-কা মাল, দরিয়ামে ঢাল।
         দুশো বছরের পুরনো ইতিহাসের নিদর্শনটিকে সংস্কারের মাধ্যমে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে রানীর কাচারি বাড়িটি যাতে তৎকালীন ইতিহাসের উপাদান হিসাবে তুলে ধরার জন্য সংরক্ষণের প্রত্নতত্ত্ব  বিভাগের কাছে দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
        উপজেলার জয়নগর ইউনিয়ন ভূমি অফিসের উপসহকারি ভূমি কর্মকর্তা মো. ইদ্রিস মিয়া নিউজ সোনার বাংলাকে বলেন,‘সরকারের অর্পিত সম্পত্তির তালিকাভূক্ত কাছারি বাড়িটি ও জমির বিষয়ে তিনি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিত ভাবে জাননো হয়েছে।’
        কালিয়ার সহকারি কমিমনার (ভূমি) মো.জহুরুল ইসলাম নিউজ সোনার বাংলাকে  কে বলেন,‘কালের সাক্ষীটিকে সংরক্ষণসহ প্রত্নতত্ত্ব  বিভাগের কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়াটি চলমান রয়েছে। কাছারিটির প্রয়োজনীয় তথ্যাদি জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে।’


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
Theme Created By Uttoron Host