সুখী দেশ সুইডেন ও ফিনল্যান্ড কখনো ন্যাটোর সদস্য হতে আগ্রহী ছিল না। ইউক্রেন পরিস্থিতিতে নিরপেক্ষ থাকা দেশ দুটি এখন ন্যাটোয় যোগ দিতে চায়। কিন্তু তুরস্কের অপ্রত্যাশিত আপত্তির কারণে তারা বাধার মুখে পড়েছে।
তুরস্ক জোটের ‘উন্মুক্ত দ্বার’ নীতি সমর্থন করে। তবে আঙ্কারার এই ভেটো শক্তির কারণে পূর্ব ভূমধ্যসাগরে অবস্থান, সিরিয়ায় অভিযান ও ঘরোয়া রাজনীতিতে স্থিতবস্থার পরিবর্তন ও লক্ষ্য অর্জন হতে পারে।
ন্যাটো-তুরস্ক সম্পর্ক
ন্যাটোর সঙ্গে তুরস্কের সম্পর্ক সমান্তরাল নয়। এর আগেও তারা জোটের সিদ্ধান্তে ভেটো দিয়েছিল। ২০০৯ সালে ন্যাটোর মহাসচিব হিসেবে সাবেক ডেনিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডার্স ফগ রাসমুসেনের নিয়োগে বাধা দেয় তুরস্ক। অবশ্য বাধা দেওয়ার যৌক্তিক কারণও তোলে দেশটি। ২০০৬ মহানবী হজরত মুহাম্মদকে (সা.) নিয়ে ব্যঙ্গ কার্টুন প্রচারের অনুমতি দিয়েছিলেন ওই প্রধানমন্ত্রী। এ ছাড়া ডেনমার্ক থেকে একটি বিদ্রোহী কুর্দি টিভি স্টেশন তুরস্কে সম্প্রচারের অনুমতিও দিয়েছিলেন তিনি।
ন্যাটো ইস্যুতে তুরস্কের ত্যাড়ামি করার আরেকটি কারণ রয়েছে। ২০১৯ সালে সিরিয়ায় কুর্দি বাহিনীর বিরুদ্ধে তুরস্কের সামরিক অভিযানের সমালোচনা করে ন্যাটো। তুরস্ক এখন সুইডেন ও ফিনল্যান্ড ইস্যুতে যে অবস্থান নিয়েছে, তা আগের ঘটনার প্রতিক্রিয়া। সেই সঙ্গে ভূরাজনীতি, পশ্চিমা ও রাশিয়ার মধ্যে সম্পর্কের অবনতি ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও রয়েছে।
সিরিয়ায় তুরস্কের বিরুদ্ধে ২০১৯ সাল থেকে অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা পরিচালনা করছে ন্যাটোপ্রত্যাশী সুইডেন ও ফিনল্যান্ড। তুরস্কের অভিযোগ, উত্তর সিরিয়ায় কুর্দিশ পিপলস ডিফেন্স ফোর্সকে (ওয়াইপিজি) সমর্থন দেয় দেশ দুটি। ওয়াইপিজি হলো কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টির (পিকেকে) অঙ্গসংগঠন। এটিকে জঙ্গি সংগঠন হিসেবে স্বীকৃত দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)।
সুইডেনে বিপুলসংখ্যক (প্রায় এক লাখ) কুর্দি শরণার্থী রয়েছে। কুর্দি গোষ্ঠীর সঙ্গে সুইডেনের সম্পর্ক নিয়ে তুরস্কের দীর্ঘদিনের অস্বস্তি রয়েছে। ২০২১ সালে সুইডেনে কুর্দিশ সমর্থিত প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ায় আরও উদ্বেগে বাড়ে তুরস্কের। তুরস্কের দাবি, সুইডেন কুর্দিদের সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করে। এটি ইউরোপীয় চেতনার পরিপন্থি।
আঙ্কারা যদি কুর্দিদের প্রতি সমর্থন কমানোর শর্তে সুইডেন ও ফিনল্যান্ডকে ছাড় দেয়, তাহলে এটি তুরস্কের জন্য বিজয় হিসেবে দেখা দেবে। পূর্ব ভূমধ্যসাগর ও নতুন ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তুরস্কের স্ট্যাটাসকো পরিবর্তন হবে। সে ক্ষেত্রে সুইডেন ও ফিনল্যান্ডকে আশ্বাস দিতে হবে, তারা তুরস্কের অভিযানের বিরুদ্ধে কুর্দিদের সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করবে না। একই সঙ্গে ন্যাটোর কোনো মিত্র সশস্ত্র হামলার শিকার হলে চুক্তির অনুচ্ছদ ৫ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে এবং ভেটো দেবে না।
পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় জ্বালানি রাজনীতির প্রধান খেলোয়াড় গ্রিস। দেশটি তুরস্ককে বাদ ইউরোপে প্রাকৃতিক গ্যাসের বাণিজ্য করতে একটি জোট গঠন করেছে। এই জোটের অন্য সদস্যরা হলো ইসরাইল, মিশর ও সাইপ্রাস।
এ ছাড়া তুর্কি পেট্রোলিয়াম ইনকরপোরেটেড কোম্পানির দুই নির্বাহীকে ‘অবৈধ ড্রিলিং কার্যকলাপের’ জন্য নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে ইইউ। সাইপ্রাসের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এ নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়।
এদিকে রাশিয়ার জ্বালানিনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছে ইইউ। তারা বিকল্প জ্বালানি উৎসের সন্ধান করছে। এ পরিস্থিতিতে আঙ্কারা নিজেকে পশ্চিমাদের জন্য জ্বালানিনির্ভর করার স্বপ্ন দেখছে। তবে তুরস্ক যদি সুইডেন ও ফিনল্যান্ডের ন্যাটোয় যোগদানের বিরোধিতা বাড়ায়, তাহলে গ্রিস ও সাইপ্রাসের সঙ্গে দ্বন্দ্ব বাড়বে এবং জ্বালানিনির্ভর হতে পারবে না।
ঘরোয়া রাজনীতিতে এরদোগান
তুরস্কের কূটনৈতিক কৌশলে ঘরোয়া রাজনীতিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। সবশেষ জরিপ অনুসারে, এরদোগান ২০২৩ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কঠোর বিরোধিতার মুখোমুখি পড়তে পারেন। গভীর অর্থনেতিক সংকট, উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি ও তুর্কি মুদ্রা লিরার অবমূল্যায়নের কারণে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারাতে পারে এরদোগানের দল।
তবে এরদোগানের মতো পাকা রাজনীতিক ভালো করেই জানেন, কীভাবে দেশ ও বিদেশে নিজের অবস্থান রক্ষা করা যায়। গ্রিস ও কুর্দি বাহিনীর সমর্থনদাতা সুইডেন ও ফিনল্যান্ডের বিরুদ্ধে তার কড়া অবস্থান দেশীয় রাজনীতিতে তাকে আরও শক্তিশালী ও গ্রহণযোগ্য করবে।
তুরস্ক জানে, তারা সুইডেন ও ফিনল্যান্ডের সদস্যপদ চিরতরে আটকাতে পারবে না। কিন্তু এই ইস্যুতে নিজের কিছু চাওয়া পূর্ণ করতে পারে। ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক সংকট ব্যবহার করে এরদোগান ঘরোয়া রাজনীতির সমস্যা থেকে পার পেয়ে গেছেন।