রয়েল আহমেদ, শৈলকুপা (ঝিনাইদহ) প্রতিনিধি: ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলায় কুমার নদের তীরে অবস্থিত শৈলকুপা শাহী মসজিদ দক্ষিণবঙ্গে সুলতানি আমলের স্থাপত্যকীর্তির একটি উল্লেখযোগ্য নিদর্শন। শৈলকুপা শহর হতে ১ কিঃ মিঃ দুরে মসজিদটি অবস্থিত।
উত্তর-দক্ষিণে লম্বা এ মসজিদের আয়তন (ভিতরের দিকে) ৩১.৫/২১ ফুট। দেয়ালগুলো প্রায় ৫.৫ ফুট প্রশস্ত। চার কোণে আছে চারটি মিনার। এগুলো গোলাকার এবং বলয়াকারে স্ফীতরেখা (ব্যান্ড) দ্বারা অলংকৃত। মিনারগুলো মসজিদের অনেক উপরে উঠে গেছে।
মসজিদের পূর্ব দেয়ালে তিনটি এবং উত্তর ও দক্ষিণ দেয়ালে দু’টি করে প্রবেশ পথ আছে। পূর্ব দেয়ালের কেন্দ্রীয় প্রবেশ পথের উভয় পাশে একটি করে সরত মিনার আছে এবং এগুলো কোণের মিনারের চেয়ে কিছু নিচু। ভিতরে পশ্চিম দেয়ালে তিনটি মেহরাব। কেন্দ্রীয় মেহরাবটি আকারে বড়। মসজিদের ভিতরে পাঁচ ফুট উঁচু দুটি স্তম্ভ আছে। এগুলোর উপরে আছে ইটের তৈরি খিলান। এ দুটো স্তম্ভ ও চার পাশের দেয়ালের উপর নির্মিত হয়েছে ছয়টি গম্বুজ। এগুলো আকারে বেশ ছোট। মসজিদটি প্রধানতঃ ইটের তৈরি। এ মসজিদে এত সংস্কার ও সংযোজন হয়েছে যে, এর আদি কাঠামো কি ছিল তা সঠিকভাবে নিরুপণ করা সহজ নয়। এ মসজিদ সুলতান নাসির উদ্দিন নুসরত শাহ’র শাসনামলে নির্মিত। মসজিদের ইতিহাস খুঁজতে গিয়ে জানা গেছে, সুলতান নাসির উদ্দিন নুসরত শাহ ছিলেন সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহ’র যোগ্য উত্তরাধিকারী। ১৫১৯ সালে বাবার মৃত্যুর পর নাসির উদ্দিন নুসরত শাহ বাংলার সিংহাসনে বসেন। ১৫৩২ সাল পর্যন্ত রাজকর্মে রাজধানী গৌড় থেকে ঢাকা যাবার পথে বেশ কয়েকদিন শৈলকুপায় অবস্থান করেন। এখানে সুলতানের সঙ্গে তার ধর্মপরায়ণ দরবেশ আরব শাহও ছিলেন। শৈলকুপার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে আরব শাহ এখানে থেকে যাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করেন। হাকিম খান ও সৈয়দ আব্দুল কাদের বাগদাদী নামে আরব শাহ’র দুই শিষ্যসহ তিনজন শৈলকুপা শহরে থাকার পক্ষে মত দেন। পরে সুলতান নাসির উদ্দিন নুসরত শাহ মসজিদ সংস্কার, সংরক্ষণ ও পরিচালনার জন্য কয়েকশ বিঘা জমি মসজিদের নামে ওয়াকফ করে দেন। এর আগে, এলাকাটি ছিল অনেকটা জঙ্গলের মতো। কথিত আছে, মসজিদটি এক রাতের মধ্যে নির্মাণ করা হয়েছিল। ঐতিহ্যবাহী এ মসজিদের নানা অংশে রয়েছে সুলতানি আমলের স্থাপত্যশৈলির নিদর্শন।
শৈলকুপা শাহী মসজিদের বর্তমান খতিব ও ইমাম হাফেজ মো. আনোয়ার হোসাইন জানান, এ মসজিদটি পাথরের বিমের উপর দাঁড়িয়ে আছে। পাশাপাশি এর উপরে রয়েছে ছয়টি সুবিশাল গম্বুজ। এদিকে, মসজিদটির বাইরে পূর্বদিকে একটি মাজার রয়েছে। যেখানে দুটি কবরের মধ্যে বড়টি শাহ সৈয়দ আরেফ-এ-রব্বানী ওরফে আরব শাহ-এর এবং ছোটটি সৈয়দ আব্দুল কাদের বাগদাদীর। প্রাচীন এই স্থাপত্য নিদর্শন দেখতে আজও দেশ বিদেশ থেকে ছুটে আসেন অনেকেই। মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান মজীনাও এসে ছিলেন এখানে। হাজার বছরের পুরোনো এই মসজিদে স্থানীয়রা শুধু নামাজই আদায় করেন না, আশপাশের এলাকা ও দূর-দূরান্ত থেকে বিভিন্ন মনোবাসনা নিয়েও ছুটে আসেন অনেকে।