১৯৭৫ সালের ১৫ ই আগস্ট বাঙালী জাতির হৃদয়ের কান্না , বাঙালী জাতির নিরন্তর রক্তক্ষরণের দিন । পৃথিবীর সমস্ত সভ্যতাকে হার মানিয়ে মানব ইতিহাসের ভয়াবহ নিষ্ঠুরতম হত্যাকান্ড ঘটেছিল এই দিনে।
১৯৭৫ সালের ১৫ ই আগস্টের কালো রাতে খুনি মােশতাক – জিয়ার প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় খুনি সর্দার ফারুক – রশিদের নেতৃত্বে ঘাতকেরা প্রায় একই সময় ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাসায় , ঢাকার মন্ত্রিপাড়ায় মিন্টু রােডে তার ভগ্নীপতি মন্ত্রী সভার সদস্য আব্দুর রব সেরনিয়াবাত ও ধানমন্ডির আরেকটি বাসায় তার ভাগ্নে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক যুবনেতা ফজলুল হক মর্নির বাস ভবনে হামলা চালায়।
ঘাতকেরা বাঙালী জাতির পিতাকেই শুধু হত্যা করেনি , হত্যা করেছে একটা পুরাে জাতিকে , বাঙালী জাতির আশা-আকাঙ্খার প্রতীক , ভবিষ্যতের চলার পাথেয় জাতির কান্ডারী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে।
তারা শুধু এ কাজটি করেই ক্ষান্ত হয়নি তারা একের পর এক নারকীয় হত্যাকান্ডে মেতে উঠে।এ যেন মানুষ হত্যার মহােতসব। তারা হত্যা করে বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিবকে হত্যা করে বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ পুত্র শেখ কামাল , ২য় পুত্র শেখ জামাল, বঙ্গবন্ধুর একমাত্র ভ্রাতা শেখ আবু নাসের , বঙ্গবন্ধুর দুই পুত্র বধু সুলতানা কামাল , পারভীন জামাল রােজী , বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠ পুত্র শিশু রাসেল , বঙ্গবন্ধুর ভগ্নিপতি ও মন্ত্রিসভার সদস্য আব্দুর রব সেরনিয়াবাত , বঙ্গবন্ধুর অতিস্নেহ পুত্রতুল্যভাগ্নে ও আওয়ামী যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান শেখ ফজলুল হক মনি , শেখ মনির সন্তান সম্ভবা স্ত্রী বেগম আরজু মনি , সেরনিয়াবাতের কিশােরী কন্যা বেবী সেরনিয়াবাত , শিশু পুত্র আরিফ সেরনিয়াবাত , শিশু পৌত্র সুকান্ত আবদুল্লাহ বাবু , ভ্রাতুষপুত্র শহীদ সেরনিয়াবাত , আওয়ামী লীগ নেতা আমির হোসেন আমুর খালাতাে ভাই আব্দুল নঈম খান রিন্টু , বঙ্গবন্ধুর প্রধান নিরাপত্তা অফিসার কর্ণেল জামিল উদ্দিন আহম্মেদ , পুলিশের এসবি অফিসার সিদ্দিকুর রহমান , সেনা সদস্য সৈয়দ মাহাবুবুল হক ও ১৫ ই আগস্ট খুনীদের গােলায় নিহত মােহম্মদপুরের বস্তিঘরের নিরীহ রিজিয়া বেগম , রাশেদা বেগম , সাবেরা বেগম , আনােয়ারা বেগম , আনােয়ারা বেগম ২ , সয়ফুল বিবি , হাবীবুর রহমান , আবদুল্লা , রফিকুল , শাহাবুদ্দিন ও আমিনুদ্দিন ।
আগস্ট বড় দুঃখ বেদনার মাস , স্বজন হারানাের মাস । ১৫ ই আগস্ট বাংলার স্বাধীনতাকামী মানুষ ও বিশ্বের বিবেকবান মানুষ চোখের অশ্রু ঝরায়।
১৯৭৫ সালের ১৫ ই আগস্ট মানব সভ্যতার বীভৎস, পৈশাচিক নির্মম হত্যাকান্ডের প্রত্যক্ষদর্শী জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের তৎকালীন আবাসিক পি.এ বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের মামলার বাদি প্রয়াত আ.ফ.ম. মহিতুল ইসলাম সরকারী কাজে ঝিনাইদহ সার্কিট হাউসে অবস্থান কালে আমরা আওয়ামী লীগের তরুন কর্মীরা তার সঙ্গে সাক্ষাত করে ১৫ ই আগস্ট লৌহমর্ষক বঙ্গবন্ধু সহ অন্যান্যদের হত্যাকান্ডের কাহিনী শুনেছিলাম এবং আমি লিপিবদ্ধ করেছিলাম।
সেখান থেকে উদ্ধৃত করলাম
“ ১৯৭৫ সালের ১৫ ই আগস্ট ভােররাতে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কের বাড়িটি আক্রান্ত হওয়ার আগেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার আত্মীয় ও মন্ত্রিসভার সদস্য আবদুর রব সেরনিয়াবাতের হত্যাকান্ডের খবর পেয়ে যান । যে ঘরে বঙ্গবন্ধু ছিলেন তার বাইরের বারান্দায় ঘুমিয়েছিল গৃহকর্মী মােঃ সেলিম ( আবদুল ) ও আবদুর রহমান শেখ ( রমা ) উপর থেকেই বঙ্গবন্ধু নিচতলায় তাঁর ব্যক্তিগত সহকারী মহিতুল ইসলামকে টেলিফোন করে বলেন , ‘ সেরনিয়াবাতের বাসায় দুষ্কৃতকারীরা আক্রমণ করেছে। জলদি পুলিশ কন্ট্রোল রুমে ফোন লাগা।
‘ পুলিশ কন্ট্রোল রুমে ফোন করে কোনাে সাড়াশব্দ পেয়ে , মহিতুল গণভবন (তৎকালীন রাষ্ট্রপতির কার্যালয়) এক্সচেঞ্জে চেষ্টা করতে থাকেন । ভোর সাড়ে ৫ টার দিকে বঙ্গবন্ধুর বাড়ির রক্ষীরা বিউগল বাজিয়ে জাতীয় পতাকা উত্তোলন শুরু করা মাত্রই বাড়িটি লক্ষ্য করে দক্ষিণ দিক থেকে সরাসরি আক্রমণ শুরু হয়।
একটু পরেই বঙ্গবন্ধু তার ঘরের দরজা খুলে বারান্দায় বেরিয়ে আসেন। ঘুম থেকে ওঠে গৃহকর্মী আবদুল আর রমা। বেগম মুজিবের কথায় রমা নিচে নেমে মেইন গেটের বাইরে এসে দেখেন, সেনাবাহিনীর কিছু বিপথগামী সদস্য গুলি করতে করতে বঙ্গবন্ধুর বাড়ির দিকে এগুচ্ছে।
রমা বাড়ির ভেতরে ফিরে দেখেন , লুঙ্গি আর গেঞ্জি পরা অবস্থাতেই বঙ্গবন্ধু নিচতলায় নামছেন। দোতলায় গিয়ে দেখেন , বেগম মুজিব আতঙ্কিত অবস্থায় ছােটাছুটি করছেন। রমা আর দোতলায় দাড়িয়ে না থেকে তিনতলায় চলে যান এবং বঙ্গবন্ধুর বড় ছেলে শেখ কামাল ও তার স্ত্রী সুলতানা কামালকে ঘুম থেকে ডেকে তােলেন। ঘটনা শুনে শার্ট-প্যান্ট পরে নিচতলায় নামেন শেখ কামাল।
সুলতানা কামাল আসেন দোতলা পর্যন্ত । রমা দোতলায় শেখ জামাল ও তার স্ত্রীকেও ঘুম থেকে তােলেন । জামা – কাপড় পরে শেখ জামাল তার স্ত্রীকে নিয়ে দোতলায় বেগম মুজিবের কক্ষে যান। ওদিকে গােলাগুলির মধ্যে অভ্যর্থনা কক্ষে বঙ্গবন্ধুর সামনেই বিভিন্ন জায়গায় ফোন করতে থাকেন মহিতুল।
পুলিশ কন্ট্রোল রুম ও গণভবন এক্সচেঞ্জে চেষ্টার এক পর্যায়ে রিসিভার নিয়ে বঙ্গবন্ধু নিজেই বলেন ,“আমি প্রেসিডেন্ট শেখ মুজিব বলছি ……..।’ বঙ্গবন্ধু তার কথা শেষ করতে পারেননি।একঝাক গুলি জানালার কাচ ভেঙে অফিসের দেয়ালে লাগে। কাচের এক টুকরায় মহিতুলের ডান হাতের কনুই জখম হয় । ওই জানালা দিয়ে গুলি আসতেই থাকে।
বঙ্গবন্ধু টেবিলের পাশে শুয়ে পড়েন এবং মহিতুলের হাত ধরে কাছে টেনে শুইয়ে দেন। এর মধ্যেই গৃহকর্মী আবদুলকে দিয়ে বঙ্গবন্ধুর কাছে তাঁর পাঞ্জাবি ও চশমা পাঠিয়ে দেন বেগম মুজিব।
কিছুক্ষণ পর গুলি বর্ষণ থেমে গেলে বঙ্গবন্ধু উঠে দাড়িয়ে আবদুলের হাত থেকে পাঞ্জাবি আর চশমা নিয়ে পরেন। নিচতলার ওই ঘর থেকে বারান্দায় বের হয়ে বঙ্গবন্ধু পাহারায় থাকা সেনা ও পুলিশ সদস্যদের বলেন , ‘ এত গুলি হচ্ছে , তােমরা কী করছাে ? ‘ এ কথা বলেই বঙ্গবন্ধু উপরে চলে যান ।
বঙ্গবন্ধু উপরে উঠতে না উঠতেই শেখ কামাল নিচে নেমে বারান্দায় দাঁড়িয়ে বলেন , ‘ আর্মি আর পুলিশ ভাইরা , আপনারা আমার সঙ্গে আসেন । এ সময় শেখ কামালের পেছনে গিয়ে দাঁড়ান মহিতুল ইসলাম ও পুলিশের ডেপুটি সুপারিনটেনডেন্ট ( ডিএসপি ) নুরুল ইসলাম খান।
ঠিক তখনই মেজর নূর , মেজর মহিউদ্দিন ( ল্যান্সার ) এবং ক্যাপ্টেন বজলুল হুদী সৈন্যদের নিয়ে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে ঢোকে। গেটের ভেতর ঢুকেই তারা ‘ হ্যান্ডস আপ ‘ বলে চিৎকার করতে থাকে। মহিতুল ইসলামকে টেনে ঘরের মধ্যে নিয়ে যান নুরুল ইসলাম খান। কোনাে কথা না বলেই শেখ কামালের পায়ে গুলি করে বজলুল হুদা ।
নিজেকে বাঁচাতে লাফ দিয়ে ঘরের মধ্যে গিয়ে পড়েন শেখ কামাল । মহিতুলকে বলতে থাকেন , ‘ আমি শেখ মুজিবের ছেলে শেখ কামাল । আপনি ওদেরকে বলেন।’
মহিতুল ঘাতকদের বলেন , ‘ উনি শেখ মুজিবের ছেলে শেখ কামাল । এই কথার বলার সঙ্গে সঙ্গে শেখ কামালকে লক্ষ্য করে বজলুল হুদা তার হাতের স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র দিয়ে ব্রাশফায়ার করে । সঙ্গে সঙ্গে মারা যান শেখ কামাল। এর মধ্যে একটা গুলি মহিতুলের হাঁটুতে আরেকটা নুরুল ইসলামের পায়ে লাগে। এ অবস্থাতেই মহিতুলকে টেনে নুরুল ইসলাম তার কক্ষে নিয়ে যান।
সেখানে তারা দেখেন , পুলিশের বিশেষ শাখার এক সদস্য দাড়িয়ে ভয়ে কাঁপছে । অস্ত্রটা তার পায়ের কাছে পড়ে আছে । মূহুর্তের মধ্যে ওই ঘরে ঢুকে বজলুল হুদা সবাইকে বাইরে গিয়ে দাঁড়ানাের আদেশ দেয়। নিচে কী হচ্ছে তার কিছুটা আঁচ করতে পেরেছিলেন বঙ্গবন্ধু।
তিনি দোতলায় তার ঘরের দরজা বন্ধ করে বিভিন্ন জায়গায় ফোন করতে থাকেন। এক পর্যায়ে ফোনে তাঁর সামরিক সচিব কর্নেল জামিলকে পান । তিনি তাকে বলেন , ‘ জামিল , তুমি তাড়াতাড়ি আসাে। আর্মির লােকেরা আমার বাসা অ্যাটাক করেছে। শফিউল্লাহকে ফোর্স পাঠাতে বলাে । ‘
তকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল শফিউল্লাহকেও ফোন করেন বঙ্গবন্ধু । তিনি তাকে বলেন শফিউল্লাহ তােমার ফোর্স আমার বাড়ি অ্যাটাক করেছে , কামালকে ( শেখ কামাল ) বোধ হয় মেরে ফেলেছে। তুমি জলদি ফোর্স পাঠাও । ‘ এমন কথা বলা হয়েছে বলে জানা গেছে।
তবে এ সম্পর্কে মহিতুল ইসলাম বলেন , যতদূর সম্ভব মনে পড়ে বঙ্গবন্ধুর কথা শুনার পর কর্নেল জামিল তার ব্যক্তিগত লাল রঙের গাড়ি নিয়ে বঙ্গবন্ধুর বাসার উদ্দেশ্যে রওনা হন। সঙ্গে ছিলেন নিজের গাড়িচালক আয়েন উদ্দিন। কিন্তু পথেই সোবহানবাগ মসজিদের কাছে তাঁকে গুলি করে হত্যা করে ঘাতকরা । পালিয়ে বেঁচে যান আয়েন উদ্দিন।
অপরদিকে ঘটনার সময় বঙ্গবন্ধুর বাড়ির গেটের সামনে মহিতুল , নুরুল ইসলাম , আবদুল মতিন , পুলিশের বিশেষ শাখার সদস্যসহ অন্য সদস্যদের সারি করে দাঁড় করানাে হয়। তখন ঘাতকদের একজন পুলিশের বিশেষ শাখার সদস্যকে গুলি করলে গুলিবিদ্ধ হয়ে তিনি পড়ে যান । এরপর ঘাতকরা গুলি করতে করতে উপরে চলে যায়।
তারা শেখ জামালের ঘরের বাথরুমে আশ্রয় নেওয়া গৃহকর্মী আবদুলকে গুলি করে । হতে ও পেটে গুলিবিদ্ধ অবস্থাতে তিনি সিঁড়ির পাশে গিয়ে হেলান দিয়ে বসে থাকেন । ঘটনার সময় বঙ্গবন্ধুর ঘরে তিনি ছাড়াও ছিলেন বেগম মুজিব , শেখ জামাল , শেখ রাসেল , সুলতানা কামাল , রোজী জামাল।ঘাতকরা বঙ্গবন্ধুর ঘরের বাইরে অবস্থান নেয়।
গােলাগুলি থামলে বঙ্গবন্ধু দরজা খুলে বারান্দায় বেরিয়ে এলেই ঘাতকরা তাঁকে ঘিরে ধরে । মেজর মহিউদ্দিন ও তার সঙ্গের সৈন্যদের বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন , ‘ তােরা কী চাস ? আমাকে কোথায় নিয়ে যেতে চাস ? বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিত্বের কাছে মহিউদ্দিন ঘাবড়ে যান । এ সময় নিচতলা ও দোতলায় সিঁড়ির মাঝামাঝি অবস্থান নেয় বজলুল হুদা ও নূর।
বঙ্গবন্ধুকে নিচে নিয়ে আসার সময় নূর কিছু একটা বললে মহিউদ্দিন সড়ে দাঁড়ায় । সঙ্গে সঙ্গে বজলুল হুদা ও নূর তাদের স্টেনগান দিয়ে বঙ্গবন্ধুকে গুলি করে। বঙ্গবন্ধুর বুকে ও পেটে ২৮ টি গুলি লাগে । নিথর দেহটা সিড়ির মধ্যে পড়ে থাকে । সারা সিঁড়ি ভেসে যায় রক্তে ।
এই সম্পর্কে মহিতুল বলেন , ঘাতকের উদ্দেশ্যে বঙ্গবন্ধু কথা বলার পর ব্রাশফায়ারের শব্দ শুনা যায় । এরপর তিনি আর বঙ্গবন্ধুর কন্ঠ শুনতে পান নি। ঘটনার সময় বঙ্গবন্ধুর পেছন পেছন গৃহকর্মী রমাও যাচ্ছিল। কিন্তু , ঘাতকরা তাকে ঘরের মধ্যে চলে যেতে বলে। দোতলায় শেখ রেহানার ঘরে থাকা তার চাচা শেখ নাসের ওই কক্ষে যান। তার হাতে গুলি লাগার ক্ষত ছিল।
রমা প্রথম বেগম মুজিবকে জানায় , বঙ্গবন্ধুকে গুলি করা হয়েছে । এ সময় ওই ঘরে আশ্রয় নেন বেগম মুজিব , শেখ জামাল , শেখ রাসেল , সুলতানা কামাল , রােজী জামাল , শেখ নাসের ও রমা ।
ঘাতকরা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে নিচে নেমে এসে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায় । এর পরপরই মেজর আজিজ পাশা ও রিসালদার মােসলেউদ্দিন তাদের সৈন্যসহ বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে আসে । আজিজ পাশা তার সৈন্যদের নিয়ে দোতলায় চলে যায় । তারা বঙ্গবন্ধুর ঘরের দরজায় ধাক্কা দিতে থাকে । এক পর্যায়ে তারা দরজায় গুলি করে । তখন বেগম মুজিব দরজা খুলে দেয় এবং ঘরের মধ্যে যারা আছে তাদের না মারার জন্য অনুরোধ করেন ।
ঘাতকরা বেগম মুজিব , শেখ রাসেল , শেখ নাসের ও রমাকে নিয়ে আসতে থাকে । সিঁড়িতে বঙ্গবন্ধুর লাশ দেখেই বেগম মুজিব কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং চিঙ্কার দিয়ে বলেন , “ আমি যাব না , আমাকে এখানেই মেরে ফেলাে । ‘ বেগম মুজিব নিচে নামতে অস্বীকৃতি জানান ।
ঘাতকরা শেখ রাসেল , শেখ নাসের ও রমাকে নিচে নিয়ে যায়। আর বেগম মুজিবকে তার ঘরে ফিরিয়ে নিয়ে আসে । বেগম মুজিবসহ বঙ্গবন্ধুর ঘরে আগে থেকেই অবস্থান নেওয়া শেখ জামাল , সুলতানা কামাল ও রােজী জামালকে নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করে আজিজ পাশা ও রিসালদার মােসলেউদ্দিন ।
বেগম মুজিবের নিথর দেহটি ঘরের দরজায় পড়ে থাকে । বাঁদিকে পড়ে থাকে শেখ জামালের মৃতদেহ । রােজী জামালের মুখে গুলি লাগে । আর রক্তক্ষরণে বিবর্ণ হয়ে যায় সুলতানা কামালের মুখ ।
শেখ নাসের , শেখ রাসেল আর রমাকে নিচে নিয়ে যাওয়া হয় । তাঁদের সবাইকে লাইনে দাঁড় করানাে হয়। এ সময় শেখ নাসের ঘাতকদের উদ্দেশে বলেন , ‘আমি তাে রাজনীতি করি না। কোনােরকম ব্যবসা – বাণিজ্য করে খাই । এরপর তারা শেখ নাসেরকে বলে , “ ঠিক আছে , আপনাকে কিছু বলব না । আপনি ওই ঘরে গিয়ে বসেন ।
‘ এই বলে তাকে অফিসের সঙ্গে লাগােয়া বাথরুমে নিয়ে গুলি করে । এরপর শেখ নাসের ‘ পানি , পানি ‘ বলে গােঙাতে থাকেন । তখন শেখ নাসেরের ওপর আরেকবার গুলিবর্ষণ করা হয় ।
লাইনে দাঁড়িয়ে শেখ রাসেল প্রথমে রমাকে ও পরে মহিতুল ইসলামকে জড়িয়ে ধরে বলে , “ ভাইয়া , আমাকে মারবে না তাে ? ‘ মহিতুল জবাব দেন , না ভাইয়া , তোমাকে মারবে না । এ সময় শেখ রাসেল তাঁর মায়ের কাছে যেতে চাইলে আজিজ পাশা মহিতুলের কাছ থেকে জোর করে কেড়ে নিয়ে যায়।
এ সম্পর্কে মহিতুল বলেন , রাসেলকে ঘাতকরা কেড়ে নিয়ে যাওয়ার সময় সে চিকার করে কান্নাকাটি করছিল । এরপর তাকে নিয়ে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করে ।
ঘাতক আজিজ পাশার কথামতাে এক হাবিলদার সভ্যতার সব বিধি লঙ্ঘন করে এই নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করে । গুলিতে রাসেলের চোখ বের হয়ে যায় । আর মাথার পেছনের অংশ থেতলে যায় । রাসেলের দেহটি পড়ে থাকে সুলতানা কামালের পাশে । পুরাে ঘরের মেঝেতে মােটা রক্তের আস্তরণ পড়ে গিয়েছিল । এর মাঝেই ঘাতকের দল লুটপাট চালায় ।
বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে সেদিন তার দুই মেয়ে ছিলেন না । বড়াে মেয়ে শেখ হাসিনা তার ছােটো বােন শেখ রেহানাকে নিয়ে স্বামী বিশিষ্ট পরমাণু বিজ্ঞানী ওয়াজেদ মিয়ার সঙ্গে বিদেশে অবস্থান করায় প্রাণে বেঁচে যান । ”
বঙ্গবন্ধু হত্যা কয়েকজন চাকরিচ্যুত ও চাকরিরত সেনা সদস্যদেরকে নিছক বা আকস্মিক কোনাে কর্মকান্ড নয় । জাতির জনক বঙ্গবন্ধু ও তার সরকারের পতনের লক্ষ্যে , জাসদ , ইসলামের লেবাসধারী পাকিস্তানপন্থী বিভিন্ন দল এবং চীনপন্থী উগ্র বামপন্থী দল – উপদল গুলো দেশের শান্তি ও স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করে অরাজকতা ও নৈরাজ্য সৃষ্টি করে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রেক্ষাপট সৃষ্টি করতে থাকে ।
এহেন পরিস্থিতিতে বঙ্গবন্ধু হত্যার দেশীয় রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রকারীদের তৈরী করা প্রেক্ষাপটের সুযোগে স্বাধীনতা বিরােধী অস্তিজার্তিক চক্রের সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্রেই দেশীয় ঘাতক বেইমান মােশতাক – জিয়া – রশিদ – ফারুক – ডালিম চক্রের মাধ্যমে স্বাধীনতার মহানায়ক বঙ্গবন্ধুসহ তার স্বজন ও জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করেছিল ।
একাত্তরের পরাজিত দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রকারীরা ১৫ ই আগস্ট জাতির পিতাকে নির্মমভাবে হত্যা করে একাত্তরের পরাজয়ের প্রতিশোধ নিয়েছিল ।
১৯৭৫ সালের ১৫ ই আগস্ট এই নৃশংস হত্যাকান্ডের উদ্দেশ্য ছিল বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে স্বাধীনতার অদর্শ , মূল্যবােধ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা ধর্ম নিরপেক্ষ অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের অগ্রগতিকে স্তব্দ করে দেয়া ।
প্রগতির চাকাকে স্তব্ধ করে দিয়ে বাংলাদেশকে পাকিস্থানী ভাবধারার তাবেদার রাষ্ট্রে পরিনত করার এক গভীর চক্রান্ত থেকেই সংগঠিত হয়েছিল জাতির জনকের এই নৃসংশ হত্যাকান্ড ।
চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধী , খুনি , রাজাকার – আল বদরদের রাজনৈতিকভাবে পুনর্বাসন ও ধর্মান্ধ , সাম্প্রদায়িক গােষ্ঠীকে ধর্মের নামে রাজনীতি করার সুযােগ দিয়ে জিয়াউর রহমান যে বিষবৃক্ষের বীজ রােপণ করেছিল পরবর্তীতে এরশাদ ও খালেদা জিয়ার শসিনামলে বাংলাদেশে উগ্ৰসাম্প্রদায়িক শক্তির নানামুখী উত্থান তারই ধারাবাহিকতা ।
পর্চাত্তরের ১৫ ই আগস্টের ঘাতকেরা বাংলাদেশ ও বাঙালী জাতীয়বাদ নির্মূল করার সুদুর প্রসারী লক্ষ্য নিয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নিশ্চিহ্ন করতে গিয়ে যে চরম নিষ্ঠুরতা , নীচতা , বিশ্বাসঘাতকতা দেখিয়েছে তা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল , যার প্রতিতুলনা বিশ্বে খুজে পাওয়া যাবে না । এ যেন কারবালার বিয়ােগান্তক ঘটনাকেও হার মানিয়েছে ।
বিভিন্ন রাজনৈতিক হত্যাকান্ডের ক্ষেত্রে নিহতের তালিকায় অন্তঃসত্ত্বা বা নববিবাহিত তরুণী অথবা দুগ্ধপোষ্য শিশুরা ছিল , যেমন দিল পর্চাত্তরের আগস্ট হত্যাকান্ডে নিহতদের মধ্যে ।