মঙ্গলবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৪, ০৪:১৬ পূর্বাহ্ন
নোটিশ
যে সব জেলা, উপজেলায় প্রতিনিধি নেই সেখানে প্রতিনিধি নিয়োগ দেয়া হবে। বায়োডাটা সহ নিউজ পাঠান। Email: newssonarbangla@gmail.com

হাসপাতালের ভিতরে ৬ লাশ ডাক্তার নার্স স্টাফ পলাতক

Reporter Name
Update : বৃহস্পতিবার, ৬ মে, ২০২১, ৫:৩৫ পূর্বাহ্ন

নিউজ ডেস্ক: ভারতের গুরগাঁওয়ের একটি হাসপাতালের আইসিইউ। বাইরে থেকে তালা দেয়া। ভিতরে করোনায় আক্রান্ত আশঙ্কাজনক রোগী। তাদের স্বজনরা সেখানে গিয়ে দেখলেন বাইরে থেকে তালা দেয়া। হাসপাতালে কোনো স্টাফ, কর্মকর্তা, কর্মচারি কিছুই নেই। চারদিক সুনশান নীরবতা। এ অবস্থায় তারা একটি আইসিইউতে প্রবেশ করেন। দেখেন বেডে বেডে মরে পড়ে আছেন রোগী।
গা শিউরে উঠা এমন দৃশ্য দেখে আকাশ বিদীর্ণ করে চিৎকার করলেন তারা। কেউ এগিয়ে এলো না। তারা দেখলেন আইসিইউ বেডে রোগীদের ওপর ফোকাস করে রাখা ক্যামেরা। একজন রোগীর মৃতদেহ পড়ে আছে মেঝেতে। না, এটা কোনো হরর ছবির দৃশ্য নয়। একেবারে গা শিউরে উঠার মতো সত্য ঘটনা। এমনভাবেই ভারতকে গ্রাস করেছে করোনা ভাইরাস। এই দৃশ্যের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। তাতে বলা হয়েছে, গুরগাঁওয়ে অবস্থিত কৃতী হাসপাতালে এ ঘটনার সূত্রপাত। সেখানে শুক্রবার রাতে করোনায় মারা যান কমপক্ষে ৬ রোগী। এদিনই ওই ভিডিও ধারণ করা হয়েছে। বলা হচ্ছে, অক্সিজেন সঙ্কটের কারণে মারা গিয়েছেন এসব রোগী। এর মধ্যে তিনজন মারা গেছেন আইসিইউতে। ভিডিওতে দেখা যায়, রোগীদের আত্মীয়রা হাসপাতালে প্রবেশ করে দেখেন ভিতরে ফাঁকা। কোথাও কোন ডাক্তার নেই। স্টাফ নেই। টেবিলগুলো পড়ে আছে শূন্য। এ অবস্থায় তারা এক ওয়ার্ড থেকে আরেক ওয়ার্ডে দৌড়াতে থাকেন উন্মাদের মতো। কিন্তু না, কোনো সাহায্য পেলেন না। কে সাহায্য করবে? পুরো হাসপাতালের ডাক্তার, স্টাফ, নার্সরা তো এ অবস্থায় হাসপাতাল ছেড়ে পালিয়েছেন! ভিডিওতে একজনকে বলতে শোনা যায়, কোনো ডাক্তার নেই হাসপাতালে। কোনো কেমিস্ট নেই। রিসেপশনে কেউ নেই। ভিডিওতে দেখা যায়, এসব রোগীর পরিবারের সদস্যরা নার্স স্টেশনের ভিতর দিয়ে, ওয়ার্ডে এবং কেবিনে ডাক্তার, নার্স, স্টাফদের খুঁজে হন্যে হচ্ছেন। খবর যায় পুলিশে। তারা পুলিশের সঙ্গে যুক্তিতর্কে লিপ্ত হন। জানতে চান কিভাবে রোগীদের এভাবে ফেলে রেখে, তাদেরকে মৃত্যুমুখে ঠেলে দিয়ে চিকিৎসকরা পালিয়ে যেতে পারেন।

মৃতদের আত্মীয়স্বজনরা অভিযোগ করেছেন, চিকিৎসক এবং স্টাফরা আইসিইউতে রোগীদের ফেলে রেখে পালিয়েছেন। কারণ, তাদের কাছে অক্সিজেন শেষ হয়ে গিয়েছিল। এসব ক্ষুব্ধ মানুষ স্বাভাবিকভাবেই ক্ষোভ নিয়ে পুলিশের সঙ্গে কথা কাটাকাটি করেন। খবর পেয়ে দু’জন পুলিশ সদস্য ঘটনাস্থলে ছুটে যান। এ সময় একজন আত্মীয় তাদেরকে বলেন, কিভাবে এ অবস্থায় আপনারা চিকিৎসকদের পালিয়ে যেতে দিতে পারেন? আমরা যারা প্রিয়জন হারিয়েছি, শুধু তারাই বুঝতে পারছি কি রকম বেদনা হচ্ছে আমাদের। ওদিকে মৃত ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যরা অক্সিজেন সঙ্কট এবং এ নিয়ে অবহেলার জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে দায়ী করেছেন। একদিন পরে সাংবাদিকদের ধারণ করা আরেকটি ভিডিওতে এক স্বজনকে বলতে শোনা যায়- আমার ভাতিজা মারা গেছে। তার জন্য আমি তিনটি অক্সিজেন সিলিন্ডার কিনে নিয়েছিলাম। কয়েক মিনিটের মধ্যে তা শেষ হয়ে যায়। সে মারা যায়। হাসপাতালের নিজস্ব কোনো অক্সিজেন ছিল না। ভাই হারানো একজন বলেন, আমার ভাইয়ের বয়স ছিল ৪০ বছর। এই বয়সে সে খুবই সুস্থ দেহের অধিকারী ছিল। তার অক্সিজেন লেভেল কি পর্যায়ে সে বিষয়ে কোনো স্পষ্ট কথা কখনোই বলেনি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। কিন্তু এই অক্সিজেন সঙ্কটের কারণে মারা গেছে আমার ভাই।

তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ভিন্ন সুর। তারা বলছে, চিকিৎসকরা হাসপাতাল ভবনেই অবস্থান করছিলেন। আত্মীয়দের হামলার শিকার হতে পারেন এই আশঙ্কায় তারা হাসপাতালের ক্যান্টিনে আত্মগোপন করেছিলেন। হাসপাতলের পরিচালক স্বাতী রাঠোর এনডিটিভিকে বলেছেন, ঘটনার দিন স্থানীয় সময় বিকাল ২টা থেকে প্রতিজন সরকারি কর্মকর্তাকে অক্সিজেন সঙ্কটের কথা জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। ড. রাঠোর বলেন, অক্সিজেন সঙ্কটের কারণে স্থানীয় সময় বিকাল ৪টা থেকে আমরা সব রোগীর অভিভাবককে অক্সিজেন সঙ্কটের কথা জানিয়েছি। কিন্তু কোনদিক থেকে কোন সাহায্য আসেনি। রাত ১১টা নাগাদ এর ফলে ৬ জন রোগী মারা যান।

তিনি স্বীকার করেন যে, নিজেদের জীবন বাঁচানোর জন্য স্টাফদেরকে ক্যান্টিনে পালানোর পরামর্শ দিয়েছিলেন। কারণ, এর ৬ দিন আগে অন্য রোগীদের এটেনডেন্টরা সহিংস হয়ে ওঠেন এবং হাসপাতালের স্টাফদের অপদস্ত করেন। এর পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ একটি এফআইআর করেছে। ড. রাঠোর বলেন, আমার ভয় হয়েছিল যে, আমার স্টাফরা এ সময়ে তাদের জীবন হারাতে পারেন। আসলে ওই রাতে আমার হাসপাতাল ছেড়ে কোনো স্টাফ বাইরে যাননি। তারা জীবন রক্ষার জন্য অস্থায়ীভিত্তিতে পালিয়েছিলেন। শুক্রবার রাতে ঘটনাস্থলে পুলিশ যাওয়ামাত্র ১৫ থেকে ২০ জন স্টাফের সবাই তাদের দায়িত্ব শুরু করেছেন।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে বর্তমানে তাদের হাসপাতালে করোনা আক্রান্ত ৬ জন রোগী আছেন। তাদের কাছে পর্যাপ্ত পরিমাণ অক্সিজেন আছে। পরিচালক রাঠোর বলেন, কয়েক ঘন্টা পর আবার সঙ্কট শুরু হয়ে যেতে পারে। অক্সিজেন আনতে হাসপাতালের গাড়ির চালক মোহন রাই ছুটে যান বিভিন্ন স্থানে। তিনি বলেছেন, প্রতিদিন আমরা সিলিন্ডারে অক্সিজেন ভর্তি করতে যাই। কিন্তু এটা প্রায় অসম্ভব ব্যাপার হয়ে পড়ে। আমরা ২০টি খালি সিলিন্ডার নিয়ে মানেস্বর অক্সিজেন প্ল্যান্টে বসে আছি ২৪ ঘন্টা ধরে। কিন্তু এখনও তা ভর্তি করাতে পারি নি।

ওদিকে গুরগাঁও প্রশাসন থেকে জানানো হয়েছে এই হাসপাতালটি কোভিড হাসপাতাল হিসেবে নিবন্ধিত নয়। সেখানে এতগুলো মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত হচ্ছে। গুরগাঁওয়ের ডিসি যশ গার্গ বলেন, দুটি থেকে তিনটি ফ্যাক্ট খুব পরিষ্কার। আমার প্রধান মেডিকেল অফিসার প্রাথমিকভাবে কিছু বিষয় আমাকে অবহিত করেছেন। তিনি বলেছেন, চিফ মেডিকেল অফিসারের সঙ্গে এই হাসপাতালটি কোভিড সেন্টার হিসেবে নিবন্ধিত নয়। তাই প্রথমত তাদের করোনা আক্রান্ত রোগী ভর্তি করাই উচিত নয়। কারণ, খুব নিবিড়ভাবে আমরা কোভিড হাসপাতালগুলো পর্যবেক্ষণে রাখি। এ জন্য নিবন্ধিত না হওয়ায় আমাদের রাডারে ছিল না এই হাসপাতাল। দ্বিতীয়ত, সেখানে অত্যধিক রোগী ভর্তি করা হয়েছিল। ফলে হতে পারে অসুস্থতায় না হয় অক্সিজেন সঙ্কটে মারা গেছেন ওইসব রোগী। কখন তারা এসওএস বার্তা পাঠিয়েছিল এবং কিভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছে, তা শুধু জানা যাবে তদন্ত রিপোর্টে।

করোনা চিকিৎসার হাসপাতাল হিসেবে কৃতী হাসপাতাল নিবন্ধিত নয় এ বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে ড. রাঠোর বলেন, নিবন্ধনের জন্য তার আবেদন পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে এবং তাকে করোনায় আক্রান্ত রোগীদের ভর্তি শুরু করতে মৌখিক অনুমতি দেয়া হয়েছে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
Theme Created By Uttoron Host