শুক্রবার, ২৯ অগাস্ট ২০২৫, ০৬:৫৯ অপরাহ্ন
নোটিশ
যে সব জেলা, উপজেলায় প্রতিনিধি নেই সেখানে প্রতিনিধি নিয়োগ দেয়া হবে। বায়োডাটা সহ নিউজ পাঠান। Email: newssonarbangla@gmail.com

ডুমুরিয়ার শান্তিনগর শেয়ার খালে নৌকাবাইচ জলাবদ্ধ জনপদে উৎসবের ঝলক

Reporter Name
Update : বুধবার, ২৭ আগস্ট, ২০২৫, ৭:১৮ পূর্বাহ্ন
Oplus_131072

মোঃ আনোয়ার হোসেন আকুঞ্জী.খুলনা ব্যুরো ॥ ডুমুরিয়া উপজেলার থুকড়া শেয়ার খালের বুক জুড়ে যেন প্রাণের স্রোত বইছিল। চারদিকের জলাবদ্ধতায় হাহাকার করা মানুষ হঠাৎ যেন প্রাণ ফিরে পেলো এক বিকেলে। হাজারো মানুষ নৌকা নিয়ে ভিড় করলেন খালের তীরে। কে বলবে এ জনপদে দীর্ঘদিন ধরে বেকারত্ব, জলাবদ্ধতা আর দুর্দশার ছায়া ঘনীভূত? এদিন যেন তারা সব দুঃখ ভুলে গিয়েছিল, কারণ ছিল একটাই, নৌকাবাইচ উৎসব।

মঙ্গলবার (২৬ আগস্ট) বিকেল। সূর্য পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়ছে। খালের বুকজুড়ে সাজানো নৌকা। মাঝিরা বৈঠা হাতে মহড়ায় ব্যস্ত। হঠাৎই গানের তালে ওঠে ধ্বনি “মারো টান হেইও, আরও জোরে হেইও!” ঝপঝপ বৈঠার শব্দ মিশে যায় ঢাক-ঢোল আর করতালির সঙ্গে। দর্শকদের উল্লাসে গোটা খাল যেন উৎসব মুখর স্থানে পরিণত হয়। দেখতে এসেছিলেন হাজারো মানুষ। কেউ ডিঙি নৌকায় ভাসমান মঞ্চ বানিয়ে বসেছেন, কেউ খালের তীরে বাঁশের মাচায় দাঁড়িয়ে। শিশু থেকে বৃদ্ধ সবার চোখে-মুখে উৎসবের আনন্দ। সাথে তৈলাক্ত কলা গাছে উঠা, সাঁতার, হাঁস ধরা, চেয়ার সিটিং, মহিলাদের হাড়ি খেলা, বাচ্চাদের উইকেট খেলা প্রতিযোগিতা ছিল।

বিল ডাকাতিয়া সংগ্রাম ঐক্য জোটের আয়োজনে প্রধান অতিথি ছিলেন ১২ নং রংপুর ইউনিয়ন পরিষদেও চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ সমারেশ ম-ল। তিনি বলেন, গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী খেলাগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। এ নৌকাবাইচও একসময় হারিয়ে যাবার পথে ছিল। আজকের এ আয়োজন দেখে মনে হচ্ছে, হারিয়ে যাওয়া খেলাগুলো আবার প্রাণ ফিরে পেতে পারে। আমরা চাই এ ধরনের আয়োজন অব্যাহত থাকুক।

প্রতিযোগিতায় বিল ডাকাতিয়া সংগ্রাম ঐক্য জোটের সভাপতি শেখ আমান উল্লাহ আমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন ডুমুরিয়া প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি মোঃ আনোয়ার হোসেন। অন্যান্যদেও মধ্যে উপস্থিত ছিলেন, বিএনপি নেকতা বি এম আইউব আহমেদ, ডা, আশরাফ গোলেদার, এড. মিল্টন শেখ, সাংবাদিক সুজিত ম-ল, শেখ আব্দুস সালাম, জি এম ফিরোজ, ইউপি সদস্য পাভীন আক্তার, গোলাম রব্বানী শেখ, বিএম নাজমুল ইসলাম, বি এম সামিউল ইসলামসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও ক্রীড়া প্রেমিরা।

শুরু হওয়ার আগে মাঝিদের মহড়া দেখতে দর্শকদের হিড়িক পড়ে যায়। কঠোর পরিশ্রমের সঙ্গে তাল মিলিয়ে মাঝিরা বৈঠা ঘোরাতে থাকে। কারও মুখে গান, কারও কণ্ঠে স্লোগান, পানির ফেনা উড়ে এসে ভিজিয়ে দিচ্ছে দর্শকদের।

প্রতিযোগিতায় অংশ নেয় দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা ৫টি দল। প্রতিটি নৌকায় ৫ জন মাঝি। বৈঠার ছন্দে ছন্দে গান গেয়ে এগিয়ে যায় নৌকাগুলো। উত্তেজনাপূর্ণ প্রতিযোগিতার একপর্যায়ে সীমারেখা পেরিয়ে আগে আসে ইয়াসিনের দল। রানার্সআপ হয় মামা ভাগ্নে দল। তৃতীয় স্থান অধিকার কওে ভাই বন্ধু এক্্রপ্রেস।
প্রধান অতিথি তাদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন। রাতে অনুষ্ঠিত হয় মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। খুলনার বিল ডাকাতিয়ার মানুষ দীর্ঘদিন ধরে জলাবদ্ধতায় ভুগছেন। ধান-সবজি চাষ নষ্ট, মাছ চাষে বিপর্যয়। জনজীবন চলছে দুর্দশার মাঝে। এমন বাস্তবতায় নৌকাবাইচ যেন মানুষের মনে নতুন উদ্দীপনা জাগায়। কয়েক ঘণ্টার জন্য হলেও মানুষ তাদের কষ্ট ভুলে যায়।
নৌকাবাইচ শুধু একটি খেলা নয়; এটি গ্রামীণ সংস্কৃতির অংশ। এখানে আছে মাঝিদের শক্তি, কণ্ঠের গান, গ্রামের মানুষের ঐক্য আর আনন্দ। তরুণ-যুবকরা এতে অংশ নিয়ে দলবদ্ধভাবে কাজ করার শিক্ষা পায়। প্রবীণরা ফিরে পান তাঁদের শৈশব-যৌবনের স্মৃতি।
আয়োজকরা জানিয়েছেন, এ ধরনের আয়োজন তারা প্রতিবছর করার চেষ্টা করবেন। তবে এজন্য প্রয়োজন সরকারি ও বেসরকারি সহযোগিতা। স্থানীয় ক্রীড়া প্রেমীরাও চান ডুমুরিয়া ও আশপাশের জলাবদ্ধ জনপদে নিয়মিত এ ধরনের উৎসব হলে গ্রামীণ সংস্কৃতি বাঁচবে, মানুষ পাবে বিনোদন, আর তরুণরা জড়িয়ে পড়বে খেলাধুলায়।
খালের বুকজুড়ে শেষ বিকেলের আলোয় বৈঠার ঝাপটা, দর্শকের উল্লাস আর গান সব মিলিয়ে থুকড়া শান্তি নগর শেয়ার বাহ খালে নৌকাবাইচের এ আয়োজন দীর্ঘদিন মনে রাখবে এলাকাবাসী।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
Theme Created By Uttoron Host