Monday, October 21, 2019, 1:30 am

সংবাদ শিরোনাম :
জাতিসংঘের ৭৪তম অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কে প্রধানমন্ত্রী ‘তথ্য-প্রমাণ পেলে সম্রাটের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা’ যুক্তরাষ্ট্রকে বাড়াবাড়ি না করতে ইরানের হুঁশিয়ারি কুষ্টিয়া সদর থানা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মিজু আটক লতা মঙ্গেশকরের গানে বাঁশি বাজিয়ে ভাইরাল তরুণী অবৈধ জুয়ার আড্ডা বা ক্যাসিনো চলতে দেয়া হবে না: ডিএমপি কমিশনার যুবলীগ নেতা খালেদের বিরুদ্ধে ৩ মামলা, গুলশান থানায় হস্তান্তর ১০ টাকার টিকিট কেটে চোখ দেখালেন প্রধানমন্ত্রী এ বছরে প্রায় ৮ কোটি টাকার রাজস্ব আদায় করেছে ঝিনাইদহ বিআরটিএ ঝিনাইদহে গুলিবিদ্ধ মাদক ব্যবসায়ী গ্রেফতার, মাদক উদ্ধার সড়ক দুর্ঘটনা থেকে বাঁচার উপায় -মোঃ সালাহউদ্দিন, পুলিশ পরিদর্শক জামালপুরের সেই ডিসি ওএসডি হলেন

শিক্ষা, বেকার এবং কর্ম

শিক্ষা মানুষের সব দৈন্যদশা, অভাব-অনটন থেকে মুক্ত করারই কথা, অথচ আমাদের দিন দিন দৈন্যের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। কারণ বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থা সমস্যা-সম্ভাবনা বিচার-বিশ্লেষণ করে একটি গবেষণালব্ধ মানবসম্পদ উন্নয়নের শিক্ষা পদ্ধতি বা শিক্ষাব্যবস্থা এখনো বাংলাদেশে চালু হয়নি, ফলে যা হওয়ার তাই। সম্প্রতি জাকির হোসেন বাচ্চু নামের জাপান প্রবাসী এক ব্যক্তি, তার জাপানের শিক্ষা অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিতে গিয়ে এক নিবন্ধে উল্লেখ করেছেন, “জাপানে শিক্ষাব্যবস্থায়, আগে ‘নীতি’ পরে ‘শিক্ষা’।”

শিক্ষা, বেকার এবং কর্ম
ফাইল ছবি

শিক্ষা মানুষের সব দৈন্যদশা, অভাব-অনটন থেকে মুক্ত করারই কথা, অথচ আমাদের দিন দিন দৈন্যের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। কারণ বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থা সমস্যা-সম্ভাবনা বিচার-বিশ্লেষণ করে একটি গবেষণালব্ধ মানবসম্পদ উন্নয়নের শিক্ষা পদ্ধতি বা শিক্ষাব্যবস্থা এখনো বাংলাদেশে চালু হয়নি, ফলে যা হওয়ার তাই। সম্প্রতি জাকির হোসেন বাচ্চু নামের জাপান প্রবাসী এক ব্যক্তি, তার জাপানের শিক্ষা অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিতে গিয়ে এক নিবন্ধে উল্লেখ করেছেন, “জাপানে শিক্ষাব্যবস্থায়, আগে ‘নীতি’ পরে ‘শিক্ষা’।” এই আদর্শ মেনে কমপক্ষে শিশুর দশ বছর বয়স পর্যন্ত অর্থাৎ চতুর্থ গ্রেড পর্যন্ত কোনো পরীক্ষা সেখানে নেই। আদর্শটি এমন যে, স্কুলজীবনে প্রথম তিন বছর মেধা যাচাইয়ের সঙ্গে সঙ্গে ভদ্রতা, নম্রতা, শিষ্টাচার, দেশপ্রেম ও ন্যায়পরায়ণতা শেখানো হয়। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ভদ্র জাতি হিসেবে জাপানিজরা যে খ্যাতি অর্জন করেছে, তা তাদের শিক্ষাব্যবস্থারই প্রতিফলন। এই জাপানে কোনো স্কুলেই ঝাড়–দার থাকে না। ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক ও অভিভাবকরা মিলে প্রতিষ্ঠান আঙিনা, নি নিজ বাড়ি পরিষ্কার করেন। বছরে একদিন কিনিং ডে হিসেবে উদযাপন করা হয়। তিনি তার অভিজ্ঞতায় বলেছেন, (জবধফরহম ভড়ৎ ঢ়ষবধংঁৎব) ‘আনন্দের জন্য পড়াশোনা’ কী জিনিস সেটা জাপানেই রয়েছে। আমার ছেলেটি স্কুলে যাওয়ার যে ব্যাকুলতা তা দেখেছি জাপানেই। তার এই বক্তব্যের সঙ্গে বাংলাদেশের শিশু শিক্ষাসংশ্লিষ্টদের কতটুকু মিল রয়েছে? আমরা কি সেই ধরনের গবেষণালব্ধ শিক্ষা পরিবেশ তৈরি করতে পেরেছি? জাপানে একজন অভিভাবক তার সন্তানের স্কুলের শ্রেণি পাঠদান ভিজিট করতে পারে না। শ্রেণিকক্ষের শেষ সারিতে অভিভাবক ভিজিটরদের বসার নির্দিষ্ট জায়গা রয়েছে। আমাদের দেশে ভিজিট তো দূরের কথা অভিভাবক কাস চলাকালে শ্রেণিকক্ষের ধারেকাছে পৌঁছতে পারে না। এ যেন ১৪৪ ধারা জারি করা একটি নিষিদ্ধ অঞ্চল। মজার বিষয়, প্রতিটি পিরিয়ডে শিক্ষার্থীরা ইচ্ছা অনুযায়ী কাস থেকে বের হতে পারে, রাস্তায় গিয়ে ট্রাফিক সিগন্যাল, আইন সম্পর্কে জানতে পারে। অর্থাৎ শিক্ষার্থীকে ‘ফরমাল’ শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলা হয়। কোয়ালিটি এডুকেশনকে গ্রহণ করার জন্য একজন শিক্ষার্থী পারিপার্শ্বিক এবং আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটও অনেকাংশে দায়ী। জাপানে মূল্যায়নের তিনটি মানদ- ঊীপবষষবহঃ (চমৎকার), এড়ড়ফ (ভালো), ঘববফ সড়ৎব রসঢ়ৎড়াবসবহঃ (আরও অধিক উন্নতির প্রয়োজন)। বাংলাদেশের একসময়কার ফার্স্ট ডিভিশন, সেকেন্ড ডিভিশন পরিবর্তন হয়ে মানদ- প্রসব হয়েছে জিপিএ। এর ভেতর কী আছে তা জিপিএপ্রাপ্ত প্রার্থী নিজেই জানে না। অথচ এ, বি, সি বা জিপিএ গোল্ডেন নামক আজব হরিণ পাওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমে সুস্থ শিশু-কিশোর, তরুণ-তরুণীরা মানসিক, শারীরিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে প্রতিবন্ধী হয়ে পড়ছে।

আমাদের শিশুরা বাবা-মায়ের ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার ইচ্ছাটিই পূরণ করার অসুস্থ প্রতিযোগিতায় পড়ে চরম হতাশায় ভুগছে। এই হতাশা ওই শিশুটিকে ধ্বংসযজ্ঞের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। জাপানে ইলিমেন্টারি স্কুলে প্রত্যেক কাসেই একজন শিক্ষকই সব বিষয়ে পাঠদান করান, তবে মিউজিক ও শরীরচর্চা শিক্ষক আলাদা থাকেন। তাদের এই পদ্ধতি চালু রাখার কারণ একটি, শিক্ষক যাতে শিক্ষার্থীর নাড়ি-নক্ষত্র জানতে পারে। বাংলাদেশে এমন একজন শিক্ষক আছেন যিনি তার শিক্ষার্থীর নাম-ধামসহ পুরোপুরি ব্যক্তিগত তথ্য দিতে পারবেন? পারবেন না, কারণ আমাদের পদ্ধতিতেই গলদ। তবে ব্যতিক্রম যে নেই তা হলফ করে বলছি না। জাপানে একটি কাসে ৩০-৪০ জন শিক্ষার্থী থাকে। শিক্ষক সংকট নিরসনে ওই দেশের ভলান্টিয়ার শিক্ষক রয়েছেন। প্রয়োজনে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তাদের সম্মানীর বিনিময়ে ব্যবহার করতে পারে। অথচ আমাদের দেশে এমন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যেখানে প্রয়োজনীয়সংখ্যক শিক্ষকই নেই। কর্মক্ষম জাতি গঠন এবং হতাশাগ্রস্ত প্রজন্মকে উদ্ধার করতে হলে চাই গবেষণালব্ধ শিক্ষা পদ্ধতি বা ব্যবস্থা।

বিশ্বের বাণিজ্যিক মোড়ল হিসেবে পরিচিত চীনের শিক্ষাব্যবস্থার কথা সবাই জানেন, যে দেশের মানুষরা এক সময় তাদের মাতৃভাষা গুছিয়ে বলতে পারতেন না তাদের আজ কী অবস্থা। দীর্ঘ ৬৫ বছর চীন মানবসম্পদ উন্নয়নে একতরফাভাবে কারিগরি এবং পৈতৃক পেশাগত কর্মমুখী শিক্ষার উন্নয়নে অর্থ ব্যয় করেছেন। ওই দেশটি পৃথিবীতে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হওয়ার জন্য দীর্ঘ পাঁচ বছর তাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থী ভর্তি বন্ধ রেখেছিল। তৎকালীন চীন সরকারের ধারণা, এত ছেলেমেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে কী করবে? কোথায় চাকরি পাবে? কে তাদের চাকরি দেবে? ওই সময় থেকেই চীনের ছাত্রছাত্রীদের নানা ধরনের ট্রেড কোর্সে আধুনিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। চীনের প্রতিটি বাড়ি একটি ফ্যাক্টরি, প্রত্যেক পরিবারের প্রতিজন সদস্য এক একজন ইঞ্জিনিয়ার।

চীন যেখানে মানবসম্পদ উন্নয়নের কারখানা হিসেবে শিক্ষাকে গ্রহণ করেছে, সেখানে বাংলাদেশের মতো সম্ভাবনায় একটি দেশে বেকার তৈরির কারখানা প্রতিনিয়তই গড়ে উঠছে। বিবিএসের শ্রমশক্তির জরিপের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বেকার ৪ কোটি ৮২ লাখ। এর মধ্যে ২৬ লাখই ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার। বাকিরা অলস, অদক্ষ এবং মৌসুমি বেকার। জাপান ও চীনের শিক্ষাব্যবস্থার আদলে বাংলাদেশের উজ্জ¦ল সম্ভাবনাময় জাতি গঠনে গতানুগতিক শিক্ষা পরিহার করে যদি আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সুদক্ষ জাতি গঠনে শিক্ষা পদ্ধতি চালু করা যায় তবেই বাংলাদেশ অতিদ্রুত অর্থনৈতিকভাবে বিশ্ববাজারে একতরফাভাবে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করবে। এ ক্ষেত্রে আর কালক্ষেপণ নয়, শিক্ষা, বেকার, কর্ম এবং কর্মী সৃষ্টির গবেষণালব্ধ ‘শিক্ষা ব্যবস্থা’ চালু এখন সময়ের দাবি।

য় রহিম আব্দুর রহিম : সাংবাদিক ও কলাম লেখক এবং শিশু সংগঠক

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন..

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন অথবা রেজিস্টার করুন

© All rights reserved © 2018 Newssonarbangla